অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট

অনলাইন ডেস্কঃ
২৩ মে, ২০২৬ ১০:৩৯ এএম
শেয়ার করুন:
অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট

দেশের শিশু চিকিৎসার সর্বোচ্চ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট’। কিন্তু প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, নজিরবিহীন অনিয়ম এবং অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন চরম সংকটে। চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘ সময় ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, যার প্রভাব ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও কাটেনি, বরং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বেড়েছে।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বজনপ্রীতি
প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। একাডেমিক যোগ্যতা ও নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর মাধ্যমে এটিকে অনেকটা ‘বাণিজ্যিক চর্চায়’ পরিণত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক চিকিৎসক যারা অতীতে উন্নত চাকরিতে যোগ দিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছিলেন বা অবসরের সব সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তারা পুনরায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অধ্যাপক ও উপপরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে এসেছেন। এ ছাড়া, কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই অ্যাডহক ভিত্তিতে ৬৫ জন চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যা পরে বোর্ডের চাপে বাতিল করতে হয়। এছাড়া জুলাই ছাত্র আন্দোলনের পর যোগ্যতার মাপকাঠি শিথিল করে ২২ জন ডিপ্লোমাধারী চিকিৎসককে সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টিও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
হাসপাতালের বোর্ড চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিয়মবহির্ভূত আচরণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি মন্ত্রণালয়ের ভুয়া অনুমতিপত্র ব্যবহার করে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি ব্যবহার করছেন। এছাড়া হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যক্রমে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এবং একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের ইশারায় সবকিছু পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই পরিস্থিতির কারণেই হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে।

৩৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প ও দুর্নীতির শঙ্কা
হাসপাতাল সম্প্রসারণের জন্য ৩৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের তোড়জোড় চলছে। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী প্রশাসন যে প্রকল্পটি বাতিল করেছিল, তা এখন নতুন করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন যন্ত্রপাতির নামে বড় অংকের অর্থ খরচের পরিকল্পনা থাকলেও প্রকল্পের অবকাঠামোগত ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের উন্নয়ন খাতের আর্থিক বিষয়গুলো বর্তমানে একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলেও সূত্রগুলো দাবি করেছে।

অন্যান্য সংকট
হাসপাতালের জমির ওপর নিটোর (জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান) কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অবৈধ বসবাস, চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক এবং রোগী বাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগগুলোও হাসপাতালটির সেবার মানকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
সদ্য বিদায়ী পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক শারীরিক অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও, সম্প্রসারণ প্রকল্প ও বিতর্কিত নিয়োগগুলোকে যৌক্তিক ও নিয়মানুযায়ী বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করে বিষয়টি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন।

শিশু স্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।