থানচিতে প্রবারণা পূর্ণিমার সরকারি চাল নিয়ে নয়ছয়: সিন্ডিকেটের কবলে বরাদ্দ, বিহারগুলোতে ক্ষোভ

অনুপম মারমা, থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২:৪৭ পিএম
শেয়ার করুন:
থানচিতে প্রবারণা পূর্ণিমার সরকারি চাল নিয়ে নয়ছয়: সিন্ডিকেটের কবলে বরাদ্দ, বিহারগুলোতে ক্ষোভ

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা (মহা ওয়াগোওয়া পোওয়ে) ঘিরে বান্দরবানের থানচি উপজেলায় সরকারি চাল বরাদ্দ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। খাদ্য গুদাম ও নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের একটি সিন্ডিকেট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বরাদ্দকৃত চাল কৌশলে বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে জানা গেছে। ৮৩টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি পূর্ণ সহায়তা পেলেও বাকি প্রায় ৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে নামমাত্র অর্থ দিয়ে বিদায় করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটি ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।

উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রবারণা পূর্ণিমা ও শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের লক্ষ্যে উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ৮১টি বৌদ্ধ বিহার এবং ২টি পূজামণ্ডপের অনুকূলে ৬০০ কেজি করে মোট ৪৯.৮০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। গত ১৩ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের হাতে ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) লেটার তুলে দেওয়ার কথা ছিল। 

তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের কর্মচারীরা জানান, ডিও বিতরণের সময় রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা রনি (রেমাক্রী ও তিন্দু ইউনিয়নের ৩৪টি) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর স্থানীয় প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা (থানচি ও বলীপাড়া ইউনিয়নের ৪৫টি) মোট ৭৯টি ডিও লেটার প্রভাব খাটিয়ে নিয়ে যান। মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠান (মৈত্রী শিশু সদন, করুণা শিশু সদন ও ২টি দুর্গা মন্দির) সরাসরি নিজেদের ডিও বুঝে পায়।

**কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেটের চাল বিক্রির কারসাজি:**  
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিহার পরিচালনা কমিটির সদস্যদের অভিযোগ, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও খাদ্য গুদামের (এলএসডি) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অনুপস্থিত। এ সুযোগে একটি সিন্ডিকেট ডিওগুলো স্থানীয় এক ডিলারের কাছে বিক্রি করে দেয়। ডিলার আলী হোসেনের ভাষ্যমতে, তিনি প্রতি কেজি ৩৭ টাকা দরে ৬৯টি বিহারের অনুকূলে ২২ হাজার ২০০ টাকা হারে মোট ১৫ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ টাকা মন্ত্রীর প্রতিনিধি ও ইউপি চেয়ারম্যানের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছেন। 

অথচ বিহারের অধ্যক্ষদের দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত কম অর্থ। রেমাক্রী ক্যবু পাড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উ. অগ্রবংশ ভিক্ষু এবং রেমাক্রী বাজার বিহারের অধ্যক্ষ উ. সুচিত্ত্বা মহাথেরো অভিযোগ করে বলেন, "আমাদের বলা হয়েছে ডিও বিক্রি করে ২১ হাজার ৬০০ টাকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে 'অফিস খরচ' বাবদ ১ হাজার এবং 'যুব প্রবারণা কমিটি'র নামে দেড় হাজার টাকা কেটে রেখে বাকি ১৯ হাজার টাকার পরিবর্তে মাত্র ১৫ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।" জিনিয়ং পাড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উ. কাওয়িদা ভিক্ষু জানান, তাকে মাত্র ৭ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এমনকি নারিকেল পাড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উ. চাইন্দিমা ভিক্ষু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি গত ৫ বছর ধরে সরকারের কোনো বরাদ্দই পাননি।

**ভুয়া বিহার ও তালিকার গরমিল:**  
স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা জানান, উপজেলায় ভুয়া তালিকা তৈরি করে চালের বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের থানচি শাখা সভাপতি উ. ইউসারাদা মহাথেরো বলেন, "উপজেলায় ভিক্ষু, শ্রমণ ও উপাসকসহ প্রকৃত বৌদ্ধ বিহার রয়েছে মাত্র ৩৭টি। বাকিগুলো কীভাবে তালিকাভুক্ত হলো আমাদের জানা নেই।" 

সরেজমিনে দেখা যায়, রেমাক্রীর চাইহ্লাউ পাড়া, ক্রাহ্লাঅং পাড়া এবং তিন্দুর বেশ কয়েকটি গ্রামে বৌদ্ধ জনসংখ্যা থাকলেও কোনো বিহার বা ভিক্ষু নেই। অথচ সেগুলোর নামেও বরাদ্দ তোলা হয়েছে। এছাড়া ম্রো সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ‘ক্রামা ক্যাংঘর’-এর নামেও বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে, যারা মূলত প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করে না। এ বিষয়ে থানচি সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো দাবি করেন, তিনি ২৫টি ক্রামা ক্যাংঘরের বরাদ্দ থেকে ৪ হাজার ১০০ টাকা করে কেটে নিয়ে উপাসনালয়বিহীন কয়েকটি গ্রামে ভাগ করে দিয়েছেন।

**সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:**  
অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা বলেন, "আমি ৪৫টি ডিও লেটার নিয়ে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে বিক্রি করেছি। খুচরা টাকা না থাকায় ১০০ টাকা কম রেখে প্রতিটি বিহারের অধ্যক্ষের কাছে ১৯ হাজার টাকা করে পৌঁছে দিয়েছি।" 

তবে রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা রনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমি চালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই এবং ডিও লেটার আমি নিইনি, মন্ত্রীর প্রতিনিধি নিয়েছেন।" 

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মশফিকুর রহমান বলেন, "ইউপি চেয়ারম্যানদের দেওয়া তালিকা ও গোয়েন্দা সংস্থার যাচাই-বাছাই শেষে ৮১টি বিহার ও ২টি মন্দিরের জন্য বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ডিও হস্তান্তরের পর বাইরে কে কী করেছে তা আমাদের জানা নেই। তবে 'অফিস খরচ' বাবদ কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে থানচি খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।