বিজয়-২৪ হলে মাদক-র্যাগিং: নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে কুবি শিক্ষার্থীরা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বিজয়-২৪ হলের অভ্যন্তরে মাদকাসক্তি, র্যাগিং এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন শিক্ষার্থীরা।
রোববার (১৯ এপ্রিল) উপাচার্য বরাবর এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়, যা প্রক্টরের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়েছে।
স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে হলে একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশেষ করে, হলে নিয়মিতভাবে গাঁজা সেবনের আসর বসানো হচ্ছে, যা আইনবিরোধী এবং একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
এতে আরও বলা হয়, মাদকাসক্ত কিছু শিক্ষার্থী প্রায়ই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মারামারি এবং র্যাগিংয়ের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। ফলে নতুন ও জুনিয়র শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে আতঙ্কিত ও অনিরাপদ বোধ করছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে জুনিয়রদের মাদক গ্রহণে প্ররোচিত করার অভিযোগও উঠেছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, অল্প কিছুদিন আগেও কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গাঁজাসহ আটক করে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় পুনরায় একই ধরনের অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের কাছে ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হলে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, র্যাগিং ও সহিংসতা বন্ধে কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি বৃদ্ধি, মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু এবং নিয়মিত ডোপ টেস্ট চালুর ব্যবস্থা করা।
বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট মাহমুদুল হাসান খান বলেন, “আমার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। প্রক্টর স্যার আমাকে জানিয়েছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আমরা আবার অভিযান শুরু করব। কোনো শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতায় থাকলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া আমার দায়িত্ব।”
প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম বলেন, “আমরা একটি স্মারকলিপি পেয়েছি। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা একটি সভা করেছি। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। র্যাগিং ও নিরাপত্তার বিষয়ে প্রভোস্টের সঙ্গে কথা হয়েছে।”
বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী বায়েজিদ হোসেন বলেন, “কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলের ছাদ এবং কিছু নির্দিষ্ট রুম যেন মাদকাসক্তদের জন্য সেফ হাউস হয়ে উঠেছে। রাত যত গভীর হয়, হলে মাদকাসক্তদের আনাগোনা ততই বৃদ্ধি পায়। শুধু হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরাই নয়, বিভিন্ন হল থেকে গেস্ট এসেও এখানে মাদক সেবন করেন।”
তিনি আরও বলেন, “এসব বিষয়ে হল প্রশাসন ভালোভাবেই অবগত, কিন্তু তারা কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নিচ্ছে না, যা আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক। কিছুদিন আগে গাঁজাসহ তিনজনকে রুমে হাতেনাতে আটক করে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এরপর কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল, কিন্তু গত দুই মাস ধরে আবার আগের চেয়ে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।”
আরেকজন আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ইউসুফ হোসেন বলেন, “কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে দিন দিন মাদকাসক্তির হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও নিরাপদ চলাফেরাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের পরিবেশ শিক্ষার অনুকূল নয় এবং এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত মাদক নিরাময় ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে নিয়মিত ডোপ টেস্ট চালু করা। এর মাধ্যমে মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে তাদের কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি এটি অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং ক্যাম্পাসে একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।”
What's Your Reaction?
আলী আকবর শুভ, কুবি প্রতিনিধি, কুমিল্লাঃ