নম্বর ক্লোন, জিনের বাদশা ও তান্ত্রিকের ফাঁদ: লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের ২ সদস্য গ্রেপ্তার

জাকির হোসেন, স্টাফ রিপোর্টারঃ
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ৫:০৬ পিএম
শেয়ার করুন:
নম্বর ক্লোন, জিনের বাদশা ও তান্ত্রিকের ফাঁদ: লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের ২ সদস্য গ্রেপ্তার

কখনো পরিচিত ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ক্লোন করে কম দামে চাল বিক্রির টোপ, কখনো তান্ত্রিক-কবিরাজ সেজে গোপন রোগ নিরাময়ের আশ্বাস, আবার কখনো গভীর রাতে নারীকণ্ঠে ‘জিনের বাদশা’ সেজে ভীতি প্রদর্শন—নানা কৌশলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ফরিদপুর। দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণের পর ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে ফরিদপুর পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম।

**যেভাবে চাল ব্যবসায়ীকে ফাঁদে ফেলা হয়**  
পিবিআই জানায়, প্রতারণার শিকার হওয়া রাজবাড়ী সদর উপজেলার বিনোদপুর এলাকার চাল ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ এক অভিনব প্রতারণার মুখোমুখি হন। তাঁর পূর্বপরিচিত ‘বিজয় বাবু’ নামের এক ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ক্লোন করে ফোন দেয় চক্রটি। তারা কম দামে ৩৩ টন চাল বিক্রির লোভনীয় প্রস্তাব দেয়। একপর্যায়ে জরুরি আর্থিক প্রয়োজনের কথা বলে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে বিভিন্ন নম্বরে দফায় দফায় মোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। তবে নির্দিষ্ট সময়ে চাল না পেয়ে প্রকৃত বিজয় বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন রশিদুল।

**৮ মাসের স্থবিরতা ভেঙে রহস্য উদ্ঘাটন পিবিআইয়ের**  
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম স্থানীয় থানায় মামলা করলেও আট মাসেও পুলিশ কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। পরে বাদীর নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য ফরিদপুর পিবিআইকে দায়িত্ব দেন। পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলামের নির্দেশনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাজিদুল হক খান তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্থিক লেনদেনের ডিজিটাল সূত্র ধরে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালান। ঘটনার প্রায় এক বছর পর চক্রটিকে শনাক্ত করে এর দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন তদন্তকারীরা।

**চক্রের কাজের ধরন**  
পিবিআই সূত্র জানায়, এই সংঘবদ্ধ চক্রে অন্তত পাঁচজন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। নিজেদের আড়াল করতে তারা ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে তোলা সিম ব্যবহার করত এবং প্রতারণা শেষে সেগুলো নষ্ট করে ফেলত। চক্রের সদস্যদের মধ্যে কাজের সুনির্দিষ্ট বণ্টন ছিল—কেউ ফোন করে টার্গেট করা ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলত, কেউ ক্যাশ-আউটের জন্য মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) নম্বর সরবরাহ করত, আবার কেউ মাঠপর্যায় থেকে সেই টাকা তুলে নিরাপদে মূল হোতাদের কাছে পৌঁছে দিত। চাল বিক্রির মিথ্যা আশ্বাসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করতে ও কুসংস্কারের সুযোগ নিতে চক্রটি ‘জিনের বাদশা’ ও ‘তান্ত্রিক-কবিরাজ’ সেজেও বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিত।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে প্রতারণার পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছে। চক্রের বাকি সদস্যদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব বা অপরিচিত সন্দেহজনক ফোনকলে বিভ্রান্ত না হয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর জন্য তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।