ডাকাত দলের ‘টার্গেট’ প্রবাসী ও দূরপাল্লার যাত্রী

অনলাইন ডেস্কঃ
May 24, 2026 - 14:43
ডাকাত দলের ‘টার্গেট’ প্রবাসী ও দূরপাল্লার যাত্রী

আসন্ন ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে প্রবাসী ও দূরপাল্লার যাত্রীদের মধ্যে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকারের মতো ছোট যানবাহনগুলোকে নিশানা করে অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে অপরাধী চক্র। সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা যাত্রীদের মনে যেমন ভয় সৃষ্টি করেছে, তেমনি চরম উদ্বেগে রয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও। 

পরিবহন চালক ও ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, ঢাকা ছাড়ার দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে গাড়িগুলো কুমিল্লায় প্রবেশ করে। এই জেলা পার হয়ে ফেনী সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে যে সময়টুকু লাগে, সেটিকেই অপরাধের জন্য ‘উপযুক্ত’ সময় হিসেবে বেছে নেয় দুর্বৃত্তরা। 

‘রেড জোন’ ৬ কিলোমিটার
মহাসড়কের বিভিন্ন অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দাউদকান্দি উপজেলার রায়পুর থেকে শুরু করে চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকা অপরাধের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই দীর্ঘ অংশে সন্ধ্যা নামার পর থেকেই তৎপর হয়ে ওঠে ছিনতাইকারী ও ডাকাত দল। 

সাধারণত বিদেশফেরত প্রবাসীরা যখন বিমানবন্দর থেকে ভাড়া করা প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাসে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তাদের ওপর নজর রাখা হয়। মহাসড়কের ফাঁকা জায়গায় গাড়ির গতি থামাতে লোহার রড ছুড়ে মারা ডাকাতদের অন্যতম প্রধান কৌশল। চালক গাড়িটি থামিয়ে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি পরীক্ষা করতে গেলেই সশস্ত্র অপরাধী দল চারদিক থেকে হামলে পড়ে। 

প্রবাসীদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অপরাধ
সবশেষ গত ২০ মে রাতে দেবিদ্বার-চান্দিনা সড়কের নবীয়াবাদ এলাকায় এক লোমহর্ষক ডাকাতির শিকার হন সৌদি আরব প্রবাসী আশিকুর রহমান। বিমানবন্দর থেকে সপরিবারে গ্রামের বাড়ি ফেরার পথে ডাকাতরা তাদের গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে প্রায় ২৮ লাখ টাকার সমমূল্যের দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও মালামাল ছিনিয়ে নেয়। 

এর আগে গত ১ মার্চ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ফালগুনকরা এলাকায় মালয়েশিয়া প্রবাসী বেলাল হোসেনের গাড়িটিকে একটি পিকআপ ভ্যান দিয়ে ধাক্কা মেরে গতিরোধ করা হয়। পরে একদল সশস্ত্র ডাকাত গাড়ি ভাঙচুর করে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে। এমনকি একপর্যায়ে তাদের পাসপোর্টও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে অনেক অনুরোধের পর ফেরত দেয় ডাকাতদল। এর ঠিক দুদিন আগে, অর্থাৎ ২৭ ফেব্রুয়ারি কুয়েত প্রবাসী নাইমুল ইসলামও একই এলাকায় প্রায় একই কায়দায় ডাকাতির শিকার হন।

চালকদের নিরাপত্তা শঙ্কা ও হয়রানির অভিযোগ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াতকারী চালকদের ভাষ্য, গভীর রাতে মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ফিলিং স্টেশন বা খাবার হোটেলগুলোতে যাত্রাবিরতির সময়ও নিরাপত্তা শঙ্কা থাকে। বাংলাদেশ হালকা মোটরযান চালক-মালিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি সাগর মাহমুদ টিপু বলেন, "মহাসড়কে যাত্রীবাহী গাড়িতে হামলা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের গাড়িগুলোকে বেশি টার্গেট করা হচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজিও বাড়ছে।" 

অনেক গাড়িচালকের অভিযোগ, ডাকাতির শিকার হয়ে থানায় মামলা করতে গেলে উল্টো নানা প্রশ্নের সম্মুখীন এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। এ কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা আইনি পদক্ষেপ নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য ও প্রস্তুতি

মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেছে হাইওয়ে পুলিশ। কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম জানান, মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রায় সাড়ে ৯০০ পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। বিশেষ করে রাতে ৭ প্লাটুন অতিরিক্ত টহল ও প্যাট্রোল টিম দায়িত্ব পালন করছে। 

আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ করার বিষয়ে তিনি বলেন, "ঈদে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাতে পুলিশের বিশেষ টিম বাড়ানো হয়েছে। মহাসড়কে আগের তুলনায় অপরাধের হার কমে এসেছে। তবে এই অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করতে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow