কাপ্তাই হ্রদে পানির তীব্র সংকট: বন্ধ ৩ ইউনিট, বিঘ্নিত নৌ-যোগাযোগ
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদ এখন পানিশূন্যতার চরম সংকটে। দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টি আর তীব্র তাপদাহে হ্রদের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। এর ফলে দেশের একমাত্র পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র—কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (কপাবিকে) উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে তিনটিই বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এই কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট যান্ত্রিকভাবে সচল থাকলেও কেবল পানির অভাবে পূর্ণ শক্তিতে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। রোববার (১২ এপ্রিল) সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ ও ২ নম্বর ইউনিট থেকে মাত্র ৮০ মেগাওয়াট (প্রতিটি ৪০ মেগাওয়াট করে) বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। বাকি তিনটি ইউনিট পানির অভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে হ্রদে পানির স্তর রয়েছে ৮১.০২ মিন সী লেভেল (এমএসএল)। অথচ বছরের এই সময়ে হ্রদে অন্তত ৮৫.৮০ এমএসএল পানি থাকার কথা। পানির স্তর যদি আরও কমে ৬৮ এমএসএল-এ পৌঁছায়, তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, "আমাদের সবকটি ইউনিট সচল রয়েছে, কিন্তু লেকে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় আমরা চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না। ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।"
বিপর্যস্ত নৌ-যোগাযোগ ও জনজীবন
হ্রদের পানি কমে যাওয়ায় শুধু বিদ্যুৎ খাতেই নয়, রাঙ্গামাটির দুর্গম উপজেলাগুলোর জনজীবনেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিলাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, লংগদু এবং বাঘাইছড়ি উপজেলার সাথে জেলা সদরের নৌ-যোগাযোগ যে কোনো সময় বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হ্রদের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ডুবোচর জেগে ওঠায় যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্যবাহী বোট চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বেশ কিছু এলাকায় পলি জমে হ্রদের গভীরতা কমে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
ঝুঁকিতে জীবিকা
হ্রদকেন্দ্রিক মৎস্য আহরণ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষ এখন কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, হ্রদ ড্রেজিং বা খনন না করার ফলে প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে এমন সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। টানা তাপদাহে হ্রদের পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে, আর আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বড় ধরনের বৃষ্টিপাত না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা ক্ষীণ।
এক নজরে কাপ্তাই হ্রদের বর্তমান অবস্থা:
সর্বোচ্চ পানি ধারণ ক্ষমতা: ১০৯ এমএসএল
বর্তমান পানির স্তর: ৮১.০২ এমএসএল (১২ এপ্রিল পর্যন্ত)
স্বাভাবিক স্তর (বর্তমান সময়ে): ৮৫.৮০ এমএসএল
বিপজ্জনক স্তর: ৬৮ এমএসএল (উৎপাদন বন্ধের সীমা)
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কাপ্তাই হ্রদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা না করলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
What's Your Reaction?
রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ