জুনে সড়কে ঝরল ৪৬৩ প্রাণ, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৩ জনের মৃত্যু

অনলাইন ডেস্কঃ
১৪ জুলাই, ২০২৬ ৩:০৭ পিএম
শেয়ার করুন:
জুনে সড়কে ঝরল ৪৬৩ প্রাণ, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৩ জনের মৃত্যু

গত জুন মাসে দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩ ২৩ জন। এ সময়ে সারাদেশে মোট ৫৩২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সড়ক দুর্ঘটনার এই আশঙ্কাজনক চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। গত মাসে ১৭৩ জন মোটরসাইকেল আরোহী বা চালক নিহত হয়েছেন। 

আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার উদ্বেগজনক চিত্র
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ঘটে যাওয়া মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এই বাহনটির দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৩ জন, যা মোট নিহতের ৩৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ১৩২ জন, যা মোট আহতের ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

অঞ্চলভিত্তিক দুর্ঘটনার হার
জুন মাসে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে ১২৮টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত এবং ৩৭৩ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এ বিভাগে ২৫টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের বিবরণ
জুন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িত মোট ৭৯৫টি যানবাহন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাহনভিত্তিক শতকরা হার নিচে দেওয়া হলো:
মোটরসাইকেল: ২৬.৭৯%
ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান ও লরি: ২৫.২৮%
বাস: ১৭.৩৫%
ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক: ১৪.৯৬%
সিএনজিচালিত অটোরিকশা: ৫.২৮%
নছিমন, করিমন, মাহিন্দ্রা, ও ট্রাক্টর: ৪.১৫%
কার, জিপ ও মাইক্রোবাস: ৬.১৬%

দুর্ঘটনার ধরন ও সড়কের অবস্থান
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার ৪৩ দশমিক ২৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষে, ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ গাড়িচাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় এবং ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি খাদে পড়ে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া ওড়না চাকায় পেঁচিয়ে শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষে ১ দশমিক ১২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সড়কের ধরন অনুযায়ী:
জাতীয় মহাসড়কে: ৪৪.৭৩%
আঞ্চলিক মহাসড়কে: ২৮.৩৮%
ফিডার সড়কে: ২০.৬৭%
ঢাকা মহানগরে: ৪.১৩%
চট্টগ্রাম মহানগরে: ০.৯৩%
রেলক্রসিংয়ে: ১.১২%

দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ
প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
১. জাতীয় মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল।
২. পর্যাপ্ত রোড সাইন, রোড মার্কিং ও সড়কবাতির অভাব।
৩. মহাসড়কে ডিভাইডার (মিডিয়ান) না থাকা এবং রাস্তার পাশে গাছপালার কারণে অন্ধ বাঁকের সৃষ্টি হওয়া।
৪. যানবাহন ও সড়কের যান্ত্রিক ত্রুটি।
৫. ট্রাফিক আইন অমান্য করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন।
৬. চালকদের অসচেতনতা, অদক্ষতা ও একটানা বিশ্রামহীন গাড়ি চালানো।
৭. বর্ষায় সড়কে সৃষ্ট গর্ত ও ভাঙাচোরা রাস্তা।
৮. অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে নিম্নআয়ের মানুষের বাস বা ট্রাকের ছাদে ভ্রমণ।

দুর্ঘটনা রোধে ১১ দফা সুপারিশ
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে এনে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা।
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও ‘ই-প্রসিকিউশন’ চালু করা।
চালকদের আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান এবং তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতন নিশ্চিত করা।
উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও পথচারী পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা করা।
মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও নিয়মিত ‘রোড সেফটি অডিট’ করা।
মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন উচ্ছেদ এবং ফিটনেস পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন।
পরিবহন খাতে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের একচেটিয়া আধিপত্য বন্ধ করা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে প্রতিবছর হাজারো মানুষের অকাল মৃত্যু বন্ধ করতে হলে সড়ক পরিবহন খাতকে আমলানির্ভর না রেখে দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে চালক, যাত্রী ও পথচারী সবার সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।