যেভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি টানা যেতে পারে - ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রূপরেখা
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এক মাসেরও বেশি সময় পার হলেও ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান তার অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে। পশ্চিমা শক্তির প্রবল বোমাবর্ষণ এবং নেতৃত্বের ওপর হামলার পরেও ইরান সফলভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, যা সামরিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছে। তবে এই সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ এক যুগান্তকারী রূপরেখা তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বদলে বিজয় ঘোষণা করে একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
জাভেদ জারিফের মতে, ইরান এখন আলোচনার টেবিলে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন যে, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। এমন একটি সমঝোতা হলে ইরান বিদেশের হুমকি মোকাবিলা করার বদলে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে মনোনিবেশ করার সুযোগ পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জনগণের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।
বর্তমান সংকটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী অবস্থানও জারিফ তাঁর বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন। একদিকে ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক চাপে তিনি যুদ্ধ শেষ করার পথ খুঁজছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির দাবি তুলতে পারে। জারিফ মনে করেন, গত ৪৭ বছরের বৈরিতার অবসান ঘটাতে হলে কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়, বরং একটি টেকসই 'অনাগ্রাসন চুক্তি' প্রয়োজন। যেখানে উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে একে অপরের ওপর আক্রমণ না করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জারিফ একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন। এই ব্যবস্থায় কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য বিদেশি শক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরতা কমিয়ে একটি নিজস্ব ভারসাম্যপূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিধর দেশগুলো এই চুক্তির 'গ্যারান্টি' প্রদানকারী হিসেবে কাজ করতে পারে, যাতে কোনো পক্ষই শর্ত ভঙ্গ করতে না পারে।
পরিশেষে জাভেদ জারিফ উল্লেখ করেছেন যে, এই শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না কারণ দুই পক্ষের মধ্যেই কয়েক দশকের গভীর অবিশ্বাস বিদ্যমান। বিশেষ করে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে ইরানি জনগণের মধ্যে আলোচনার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও অনীহা রয়েছে। তবুও ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা ধ্বংসাত্মক সংঘাতের মুখে সাহসিকতার সাথে শান্তির পথ প্রশস্ত করে। ইরানের সামনে এখন সুযোগ এসেছে নিজের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে একটি নতুন যুগের সূচনা করার, যেখানে সংঘাতের বদলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই হবে মূল চালিকাশক্তি।
What's Your Reaction?
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ