ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে অভিষিক্ত মুজতবা খামেনি
ইরানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ৫৬ বছর বয়সী মুজতবা হোসেইনি খামেনি। সোমবার ভোরে ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস আনুষ্ঠানিক এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেয়। এমন এক টালমাটাল সময়ে তিনি হাল ধরলেন, যখন মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের কবলে পড়ে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রাণ হারিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষস্থানীয় অনেক নীতিনির্ধারক।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানিরা রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়েছিল। ‘ভেলায়াতে ফকিহ’ বা ইসলামি আইনজ্ঞের অভিভাবকত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্রে ‘পিতা থেকে পুত্রের হাতে ক্ষমতা’ হস্তান্তরের ধারণাটি দীর্ঘকাল ধরে ছিল চরম বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মুখে তাত্ত্বিক বিতর্কের চেয়ে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখতে এই নিয়োগ কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ।
শিয়া ইসলামের কারবালা দর্শনে ‘শহীদ’ হওয়ার বিষয়টি এক পরম নৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই এই আত্মত্যাগের সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় বৈধতার স্তম্ভে পরিণত করেছে তেহরান। মুজতবা খামেনির নিয়োগকে দেশটির সরকারি ন্যারেটিভে একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। শত্রুর হাতে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের মতো তিনিও আত্মত্যাগের ধারায় যুক্ত—এই বার্তাটি দেশটির কট্টর সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের নতুন উদ্দীপনা তৈরি করতে পারে।
মুজতবা খামেনি মূলত নেপথ্যের নেতা হিসেবে পরিচিত। সরকারি কোনো পদে সরাসরি না থেকেও তিনি বছরের পর বছর ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘গেটকিপার’ হিসেবে কাজ করেছেন। ইরানের ক্লেরিক্যাল প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনী (বিশেষ করে আইআরজিসি) এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর তাঁর দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার সহযোদ্ধাদের বড় একটি অংশ এখন দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর শীর্ষপদে আসীন, যা মুজতবার জন্য এক শক্তিশালী ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছে।
মুজতবা খামেনির নিয়োগের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমাদের প্রকাশ্য বিরোধিতা ইরানি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মুজতবাকে উল্টো অভ্যন্তরীণভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে, কারণ সেখানে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রতি জনগণের তীব্র অনীহা রয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি ‘ইসরায়েল ধ্বংসের’ পথ থেকে সরে না আসে, তবে নতুন নেতাকেও তারা লক্ষ্যবস্তু করবে। মুজতবা খামেনি তাঁর বাবার চেয়েও বেশি হার্ডলাইনার বা কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত হওয়ায়, বর্তমান যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে না। আইআরজিসির সাম্প্রতিক ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যেকোনো মূল্যে ছয় মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে, যা মুজতবার নেতৃত্বাধীন ইরানের কঠোর অবস্থানেরই ইঙ্গিত দেয়।
সংকটপূর্ণ মুহূর্তে ক্ষমতা গ্রহণকারী মুজতবা খামেনির জন্য সামনে চ্যালেঞ্জ পাহাড়সম। একদিকে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট। তিনি কি পিতার অনুসারী হিসেবে শুধু আগের নীতি ধরে রাখবেন, নাকি নিজস্ব কোনো নতুন কৌশলের পথে হাঁটবেন—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট, তেহরান যুদ্ধের এই অগ্নিপরীক্ষায় কোনো সমঝোতার চেয়ে বরং লড়াইকেই অধিকতর অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ