চীনকে পাশে পাচ্ছে ইরান, কিন্তু কীভাবে

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
Mar 1, 2026 - 12:03
চীনকে পাশে পাচ্ছে ইরান, কিন্তু কীভাবে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে সংঘাত যখন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে, তখন বিশ্ব রাজনীতির অলিন্দে একটি বড় প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—চীন কি ইরানকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, সেই সহায়তার রূপই বা কেমন হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর প্রচলিত সামরিক জোটের ধারণা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। চীন সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পাঠাবে—এমন সম্ভাবনা বর্তমান বাস্তবতায় নেই বললেই চলে। তবে একে নিষ্ক্রিয়তা ভাবলে বড় ভুল হবে। একবিংশ শতাব্দীর মহাশক্তির প্রতিযোগিতায় চীন ইরানকে যে সমর্থন দিচ্ছে, তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষপের চেয়েও বেশি টেকসই ও সুদূরপ্রসারী। বেইজিংয়ের এই কৌশলী সমর্থন মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: কূটনৈতিক সুরক্ষা, সামরিক সমন্বয় এবং অর্থনৈতিক জীবনরেখা।

জাতিসংঘে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ
নিরাপত্তা পরিষদে চীন ধারাবাহিকভাবে তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র—‘ভেটো’ ক্ষমতা ব্যবহার করে আসছে। গত মাসে এক জরুরি বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রদূত সান লেই স্পষ্ট জানিয়েছেন, বলপ্রয়োগ কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বেইজিংয়ের এই অবস্থান কেবল বাগাড়ম্বর নয়, বরং এটি তেহরানকে বিশ্বমঞ্চে এক ধরনের আইনি বৈধতা এবং পশ্চিমা চাপের বিপরীতে একটি শক্তিশালী ঢাল প্রদান করে।

কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়
২০২১ সালে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (এসসিও) ইরানের অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তীতে ব্রিকস-এ যোগ দেওয়া তেহরানের জন্য নতুন দ্বোর উন্মোচন করেছে। এটি কেবল কাগজে-কলমে কোনো চুক্তি নয়, বরং মার্কিন প্রভাববলয়ের বিপরীতে একটি ‘বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের যৌথ নৌ-মহড়া সেই শক্তিশালী সমন্বয়েরই এক দৃশ্যমান মহড়া।

প্রতিরক্ষা খাতেও চীনের সহযোগিতা বাড়ছে। জানা গেছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেলের বিনিময়ে ইরান চীনের কাছ থেকে উন্নত ভূমি-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করছে। এমনকি ইরানের বিমানবাহিনী দিবসে চীনা সামরিক অ্যাটাশে কর্তৃক জে-২০ স্টেলথ ফাইটারের মডেল উপহার দেওয়াকে দুই দেশের গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রতীকী ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থনৈতিক অক্সিজেন
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভরসা চীন। বর্তমানে ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যাচ্ছে চীনের কাছে। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় চীনা রিফাইনারিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও বেইজিং পিছু হটেনি। চীন আসলে ইরানকে সেই ‘অর্থনৈতিক অক্সিজেন’ সরবরাহ করছে, যা ছাড়া তেহরানের পক্ষে পশ্চিমা চাপ মোকাবিলা করে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল।

চীন কেন সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না?
প্রশ্ন উঠতে পারে, চীন যদি এতই সাহায্য করে তবে কেন সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপের পাল্টা হুমকি দিচ্ছে না? এর মূল কারণ বেইজিংয়ের কৌশলগত অগ্রাধিকার। চীনের প্রধান লক্ষ্য হলো জাতীয় পুনরেকত্রীকরণ (তাইওয়ান ইস্যু)। এই লক্ষ্য অর্জনের আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো অকাল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না। চীন মূলত ইউক্রেন সংকটের মতো একটি মডেল অনুসরণ করছে—যেখানে তারা সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও আক্রান্ত রাষ্ট্রটির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে যায়।

উপসংহার: ‘উদ্ধার’ করার নতুন সংজ্ঞা
চীনের এই সহায়তার ধরণটি প্রচলিত কোনো সামরিক জোটের মতো নয়। যদি ‘উদ্ধার’ বলতে সরাসরি সেনা পাঠানো বোঝায়, তবে উত্তরটি হবে ‘না’। কিন্তু যদি উদ্ধার বলতে বোঝায়—ইরানকে এমনভাবে সক্ষম করে তোলা যাতে তারা টিকে থাকতে পারে, প্রতিরোধ গড়তে পারে এবং শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা করতে পারে—তবে উত্তরটি নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক।

চীন আসলে ইরানের জন্য এমন এক নতুন ধরনের ঢাল নির্মাণ করেছে, যা ইস্পাত বা বারুদ দিয়ে নয়; বরং কৌশলগত ধৈর্য, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং বহুমেরু বিশ্বের স্থাপত্য দিয়ে গড়া। এই নিভৃত কিন্তু শক্তিশালী সমর্থনই বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইরানের টিকে থাকার প্রধান চাবিকাঠি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow