মুসলিমদের কাছে জমজমের পানি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

অনলাইন ডেস্কঃ
May 27, 2026 - 10:47
মুসলিমদের কাছে জমজমের পানি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিমের কাছে জমজম কূপের পানি অত্যন্ত পবিত্র এবং অলৌকিক বরকতময় এক নিয়ামত। সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে অবস্থিত পবিত্র মসজিদুল হারামের ভেতরে, কাবা শরিফ থেকে মাত্র ২০ মিটার দূরে এই ঐতিহাসিক কূপটির অবস্থান। প্রতি বছর হজ বা ওমরাহ পালন করতে যাওয়া লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলিম দেশে ফেরার সময় পরম যত্নে জমজমের পানি সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে এই পানি বিতরণ করা মুসলিম সমাজের এক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বিশ্বাস করা হয়, ভক্তি ও নিয়তসহকারে এই পবিত্র পানি পান করলে রোগবালাই, বিপদ-আপদ ও অমঙ্গল থেকে মুক্তি মেলে।

কিন্তু মুসলিমদের কাছে জমজমের পানি কেন এত গুরুত্ব বহন করে? এর পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জমজমের উৎপত্তি

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মহান আল্লাহর নির্দেশে নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী বিবি হাজেরা ও শিশুপুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে মক্কার এক জনমানবহীন, ধূ ধূ মরুভূমিতে রেখে যান। তখন মক্কায় কোনো মানুষের বসবাস ছিল না এবং কোনো পানির উৎসও ছিল না। সাথে থাকা সামান্য খেজুর ও পানি ফুরিয়ে গেলে তৃষ্ণার্ত শিশু ইসমাইল পানির জন্য কান্নাকাটি শুরু করে। 

সন্তানের এই আকুলতায় ব্যাকুল হয়ে মা হাজেরা পানির খোঁজে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন। তীব্র সংকটের সেই মুহূর্তে আল্লাহর সাহায্যে সেখানে আগমন ঘটে ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আ.)-এর। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, জিবরাইল (আ.) মাটির ওপর আঘাত করলে সেখান থেকে পানির একটি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে। পানি যাতে বয়ে চলে না যায়, তাই মা হাজেরা বালি ও পাথর দিয়ে এর চারপাশে বাঁধ তৈরি করেন এবং মুখে উচ্চারণ করেন 'জমজম' (যার অর্থ—থেমে যাও বা প্রবাহ বন্ধ করো)। সেখান থেকেই এই কূপটির নাম হয় 'জমজম'। পরবর্তীতে এই পানির উৎসকে কেন্দ্র করেই মরুভূমির বুকে গড়ে ওঠে মক্কা নগরী এবং শুরু হয় মানব বসতি।

হারিয়ে যাওয়া ও পুনঃআবিষ্কার

কালের পরিক্রমায় মক্কার নিয়ন্ত্রণ জুরহুম গোত্রের হাতে চলে যায়। কিন্তু তাদের নানা অপকর্মের ফলে একপর্যায়ে জমজম কূপটি ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে মাটিচাপা পড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশনা পেয়ে কূপটি পুনরায় খনন ও আবিষ্কার করেন। এরপর থেকে আজ অবধি এই কূপের পানি অবিরামভাবে প্রবাহিত হয়ে আসছে।

ইসলামে জমজমের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য

যদিও হজ পালনের মূল বিধান বা রোকনগুলোর মধ্যে জমজমের পানি পান করা সরাসরি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব কাজ নয়, তবে তওয়াফ শেষে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাঈ করার আগে আল্লাহর রাসুলের সুন্নত হিসেবে হাজিরা এই পানি পান করে থাকেন।

ইসলামি বিভিন্ন রেওয়ায়েত ও হাদিসে জমজমের পানির বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, *"জমজমের পানি পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে সর্বোত্তম পানি। এতে রয়েছে তৃপ্তিদায়ক খাদ্য এবং ব্যাধির নিরাময়।"* এই বিশ্বাসের কারণেই যুগ যুগ ধরে মুসলিমরা জমজমের পানিকে আরোগ্য ও বরকতের উৎস মনে করেন।

আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত রক্ষণাবেক্ষণ

'সৌদি গেজেট'-এর তথ্য অনুযায়ী, জমজম কূপটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সচল কূপ হিসেবে বিবেচিত। প্রায় ৫ হাজার বছর ধরে এটি থেকে একটানা পানি পাওয়া যাচ্ছে। কূপটির গভীরতা মাত্র ৩০ মিটার হলেও এটি প্রতি সেকেন্ডে সাড়ে ১৮ লিটার পানি পাম্প করতে পারে।

বর্তমানে সৌদি আরবের 'জমজম স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের' অধীনে অত্যন্ত আধুনিক উপায়ে এই পানির গুণগত মান, তাপমাত্রা ও অম্লতার মাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ২০১৩ সালে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল ব্যয়ে আধুনিক উত্তোলন ও বিতরণ প্রকল্প (KPZW) চালু করা হয়। এর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পাইপের সাহায্যে পানি পরিশোধন করে মক্কার মসজিদুল হারাম এবং বিশেষ ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে মদিনার মসজিদে নববীতে দৈনিক লাখ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও গুণগত মান

বিভিন্ন সময়ে জমজমের পানির গুণগত মান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হয়েছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট 'ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন'-এ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জমজমের পানি সম্পূর্ণ রোগজীবাণুমুক্ত এবং মানবদেহের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। পরীক্ষা-নিকীক্ষায় দেখা গেছে, পানির আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সব রাসায়নিক প্যারামিটার জমজমের পানিতে অত্যন্ত চমৎকার ও সঠিক মাত্রায় রয়েছে, যা লিভার ভালো রাখতে এবং ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।

ধর্মীয় আবেগ, হাজার বছরের ঐতিহাসিক অলৌকিকত্ব এবং বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতার এক অপূর্ব মিশেলে বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে জমজমের পানি অত্যন্ত পবিত্র ও অপরিহার্য এক আধ্যাত্মিক সম্পদ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow