কেন উত্থান হচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টির
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রতি এক অদ্ভুত ও অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (তেলাপোকা জনতা পার্টি)। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে এই দলটির যে ব্যাপক উত্থান ঘটেছে, তা প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় বিস্ময় ও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো দীর্ঘমেয়াদি আদর্শ নয়, বরং মিম পেজ, ইনস্টাগ্রাম রিল আর ডিজিটাল মাধ্যমের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে পুঁজি করেই এই দলটির জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে।
প্রথাগত রাজনীতির প্রতি অনীহা ও তরুণ প্রজন্ম
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম নিজেদের চিরাচরিত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা, চাকরির অভাব এবং প্রতিদিনের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম তাদের ক্লান্ত করে তুলেছে। এই ক্লান্তি ও একাকিত্ব থেকেই জন্ম নিচ্ছে ডিজিটাল সংহতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিম বা স্লোগান নিমেষেই একজন অসহায় তরুণকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সে একা নয়, বরং সে-ও এক বিশাল আন্দোলনের অংশ। নেপাল ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সাথেও এর মিল খুঁজে পাচ্ছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।
যৌথ সামাজিক জীবনের অবক্ষয়
নিবন্ধটির লেখক সৌম্যজিৎ ভারের মতে, আজকের সংকটের মূলে রয়েছে আমাদের যৌথ সামাজিক জীবনের পতন। একসময় রাজনীতি গড়ে উঠত কলকারখানার শ্রমিক ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কিংবা পাড়ার ক্লাবের আড্ডার মধ্য দিয়ে। সেই কাঠামো আজ ধ্বংসপ্রায়। মানুষ এখন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং একা। ডিজিটাল দুনিয়ার এই সুসংগঠিত ভিড় মানুষকে সেই হারানো একাত্মতার স্বাদ দিচ্ছে। মানুষ এখন স্বাধীনতার অর্থ খোঁজে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে, যা তাকে আরো বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলছে।
ক্ষোভ বনাম দীর্ঘমেয়াদি সংহতি
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লাখ লাখ মানুষের আবেগ এক করা সহজ হলেও, সেই আবেগকে স্থায়ী রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তিতে রূপান্তর করা অত্যন্ত কঠিন। লেখক সতর্ক করে বলেছেন, শুধু ‘সাধারণ শত্রু’ বা ‘বিরোধিতা’র ওপর ভিত্তি করে কোনো আন্দোলন বেশিদিন টিকতে পারে না। যখনই এই আন্দোলন রাষ্ট্র পরিচালনার মতো বাস্তব ও জটিল সমস্যার মুখোমুখি হয়, তখনই এর ভেতরের ফাটলগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দার্শনিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
ফরাসি দার্শনিক জাক লাকাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, অনেক সময় বিদ্রোহীরা অবচেতনভাবে একজন ‘নতুন প্রভু’ বা নতুন কোনো কর্তৃত্বের সন্ধান করে। যে সমাজ মানসিকভাবে খণ্ডিত, সেখানে ক্ষণিকের আবেগ দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। আজকের এই বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা হলো—তারা যে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলছে, সেই সোশ্যাল মিডিয়া নিজেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীয় ও নিয়ন্ত্রিত শক্তি।
উপসংহার
পরিশেষে প্রশ্নটি থেকে যায়—আমাদের বর্তমান সমাজ কি ক্ষণিকের আবেগকে স্থায়ী সংহতিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা রাখে? নাকি এই নতুন রাজনৈতিক উত্থান কেবল একটি চক্রাকার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, যা দিনশেষে নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদী শক্তির জন্ম দেবে? পারস্পরিক বিশ্বাস, যৌথ দায়িত্ববোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ছাড়া কোনো আন্দোলনই স্থায়ী মুক্তি আনতে পারবে না।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ