বরকতময় আরাফার দিন

অনলাইন ডেস্কঃ
May 26, 2026 - 10:46
বরকতময় আরাফার দিন

ইসলামি শরীয়তে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ অর্থাৎ 'আরাফার দিন' বছরের শ্রেষ্ঠতম দিন হিসেবে স্বীকৃত। পবিত্র রমজান যেমন মাসের সেরা, লাইলাতুল কদর যেমন রাতের সেরা, ঠিক তেমনি দিন হিসেবে 'আরাফার দিন' অতুলনীয়। এটি কেবল হজের একটি অংশই নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত ও মাগফিরাতের এক বিশেষ বসন্ত।

হজের প্রাণকেন্দ্র: আরাফাত
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অমিয় বাণী— ‘আরাফাই হলো হজ’। অর্থাৎ ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের প্রধান রুকন। এদিন মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু থাকেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, আরাফার দিনে আল্লাহ তাআলা যত বিপুল সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, বছরের অন্য কোনো দিনে তা দেন না। এদিনে আল্লাহর অবারিত রহমত দেখে শয়তান সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছিত ও অপমানিত বোধ করে।

দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়
আরাফার দিনটি হলো প্রার্থনা ও আরজির দিন। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, "সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।" এদিন নবীজি (সা.) এবং পূর্ববর্তী নবীগণ বেশি বেশি পড়তেন: *‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির’* (অর্থ: একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই; রাজত্ব ও প্রশংসা সবই তাঁর এবং তিনি সর্বশক্তিমান)।

সওয়াব ও গুনাহ মাফ
যারা হজে যেতে পারেননি, তাদের জন্য এদিন রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুল (সা.) আশা প্রকাশ করেছেন যে, আরাফার দিনের একটি রোজা বান্দার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মোচন করে দেবে। তবে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকারী হাজিদের জন্য এদিন রোজা না রাখা সুন্নাত।

দ্বীন পূর্ণ হওয়ার দিন
আরাফার ময়দানেই ইসলামের পূর্ণতা ঘোষিত হয়েছিল। ১০ হিজরিতে বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণের সময় সুরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াতটি নাজিল হয়— "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পন্ন করলাম..."। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

আরাফার ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট
আরাফাত ময়দানের সাথে জড়িয়ে আছে মানবজাতির আদি ইতিহাস। হজরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.) দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এই ময়দানেই মিলিত হয়েছিলেন এবং তাঁদের তওবা কবুল হয়েছিল। এছাড়া সৃষ্টির আদলে 'রূহের জগতে' মহান আল্লাহ যখন সব মানুষের কাছ থেকে তাঁর প্রভুত্বের স্বীকৃতি নিয়েছিলেন, সেই ঐতিহাসিক শপথ বা ‘আহদে আলস্ত্ব’ এই আরাফাতের উপত্যকায়ই সংঘটিত হয়েছিল।

আমাদের করণীয় আমল
আরাফার দিনের বরকত লাভে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট আমল করা জরুরি:
১. তাকবিরে তাশরিক: ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর 'আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, ওয়া লিল্লাহিল হামদ' পাঠ করা।
২. নফল রোজা: হাজি সাহেবরা বাদে অন্যদের জন্য ৯ জিলহজ রোজা রাখা।
৩. বেশি বেশি জিকির ও ইস্তিগফার: তাসবিহ, তাহলিল ও দরুদ পাঠ করা।
৪. দোয়া ও মুনাজাত: আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টি একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে নিজের, পরিবারের ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে প্রার্থনা করা।

উপসংহার:
আরাফার দিন হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। বিনয় ও আকুতির মাধ্যমে আমরা যেন এই পবিত্র দিনের পূর্ণ সওয়াব হাসিল করতে পারি এবং আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে ক্ষমা ও রহমতের চাদরে ঢেকে নেন। আমিন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow