সামান্য বৃষ্টিতেই ভিজে যায় বই-খাতা ও কাপড়—দুর্ভোগে খুমি শিক্ষার্থীরা
“বছরে একবারও পুষ্টিকর খাবার, মাছ, মাংস, ডিম—খেতে পারি না। ছুটি পেলে বাড়িতে বা আত্মীয়স্বজনের বাসায় গিয়ে পেট ভরে খাই। তবুও মানুষের মতো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছাত্রাবাসে মন দিয়ে পড়াশোনা করি। শুধু ঈশ্বরকে ডাকি, যেন আমাদের বই-খাতা ও কাপড় ভিজে না যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই সব ভিজে যায়।
কথাগুলো বলছিল বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের অংহ্লা পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ছাত্রাবাসে থাকা খুমি সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী হোশী খুমি, হেনাং খুমি ও আরিশ খুমি ও হৈতং খুমী।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, “সুশিক্ষিত সন্তান পরিবার ও দেশের সম্পদ” স্লোগানে ২০১৩ সালে গ্রামবাসীদের নিজস্ব অর্থায়নে টিন, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নির্মিত ছাত্রাবাসটি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। টিনের চালা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। শীতকালে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র ও কম্বলের অভাবে তীব্র ঠান্ডায় শিক্ষার্থীরা কষ্টে থাকে। এতে তাদের স্বাভাবিক ঘুম ও পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে এসে প্রায় ৬০ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী এখানে অবস্থান করে পড়াশোনা করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলীকদম, থানচি ও লামা উপজেলা থেকেও অনেকে রয়েছে।
২০১৭ সালে স্থানীয় এনজিও সংস্থা রোয়া ক্যং নামে হিউম্যানেটারিয়ান ফাউন্ডেশন বিদ্যালয়টিতে সামান্য বেতনে তিনজন শিক্ষক নিয়োগ দেয় এবং শিক্ষার্থীদের বই-খাতা, কলমসহ শিক্ষা-সহায়তা প্রদান করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বিদ্যালয়ের জন্য একটি ভবন নির্মাণ করে দিলেও ছাত্রাবাসটি এখনো গ্রামবাসীদের নির্মিত পুরোনো কাঠামোতেই চলছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ছাত্রাবাসের পরিচালক মংক্য খুমি বলেন, “গ্রামের হতদরিদ্র অভিভাবকদের সন্তানরা এখানে পড়াশোনা করছে। ছাত্রাবাসের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দ্রুত সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ না হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক কাইথান খুমি বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাত্রছাত্রীরা বই-খাতা নিয়ে নিরাপদ জায়গা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে তাদের পড়াশোনার মনোযোগ নষ্ট হয়। একটি টেকসই ছাত্রাবাস এখন সময়ের দাবি।
পাড়া প্রধান অংহ্রা খুমি কারবারি বলেন, “২০১৩ সালে আমরা গ্রামবাসীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ছাত্রাবাসটি নির্মাণ করেছিলাম। কিন্তু এখন সেটি সংস্কারের সামর্থ্য আমাদের নেই। সরকারিভাবে সহযোগিতা প্রয়োজন।”
৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লুংথান খুমি বলেন, “অংহ্লা পাড়া বিদ্যালয়টি দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ছাত্রাবাস সংস্কারে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে। ইউনিয়ন পরিষদের টিআর, কাবিখা বা কাবিটা প্রকল্প থেকে এত বড় বরাদ্দ পাওয়া সম্ভব হয় না। তাই সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মুইশৈথুই মারমা রনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সাংবাদিকদের বয়কট ও এড়িয়ে চলা নিতি গ্রহন করছেন তিনি।
এদিকে নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি আহ্বায়ক সাচিংপ্রু জেরীর প্রতি ছাত্রাবাস সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণে জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন গ্রামবাসীরা। তাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ি এ জনপদে শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে।
গ্রামবাসীদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই ছাত্রাবাস নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
What's Your Reaction?
অনুপম মারমা, থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ