ফাইনালের আগে সমর্থকদের ঘরে ঘরে কুসংস্কার

অনলাইন ডেস্কঃ
১৮ জুলাই, ২০২৬ ১১:০৪ এএম
শেয়ার করুন:
ফাইনালের আগে সমর্থকদের ঘরে ঘরে কুসংস্কার

বিশ্বকাপ ফাইনালের মহোৎসবে মাঠের লড়াইয়ে যেমন কোচের রণকৌশল কিংবা লিওনেল মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে আছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা, মাঠের বাইরে তেমনই তাদের বড় ভরসা অন্য এক অদৃশ্য শক্তিতে। আর্জেন্টিনার ঘরে ঘরে এখন চলছে নানা ‘কুসংস্কার’ ও রীতিনীতি, যা স্থানীয়ভাবে ‘কাবালা’ নামে পরিচিত। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব বিশ্বাসের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি না থাকলেও, কোটি সমর্থকের বিশ্বাস—এই রীতিনীতিগুলোই তাদের প্রিয় দলকে এনে দেবে কাঙ্ক্ষিত সৌভাগ্য।

স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে হাজারো সমর্থক তাই আঁকড়ে ধরেছেন নিজেদের পুরোনো সব অদ্ভুত রুটিন।

বুয়েনস আইরেসের লিনিয়ার্স এলাকার বাসিন্দা আন্দ্রেস গনসালেসের বাড়িতে ম্যাচ চলাকালে কারও নিজের জায়গা থেকে ওঠার নিয়ম নেই। তাদের বিশ্বাস, যে আসনে বসে দল জিতেছে, ফাইনালেও সেখানেই বসে থাকতে হবে। এমনকি কেউ যদি বাথরুমে থাকা অবস্থায় আর্জেন্টিনা গোল দেয়, তবে ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার আর ঘরে ফেরার অনুমতি মেলে না।

একই রকম কঠোর নিয়ম মেনে চলা হয় বিক্রয়কর্মী এসতেলা ভার্গাসের বাড়িতেও। পরিবারের সবাইকে একই পোশাক পরে এবং নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে ম্যাচ দেখতে হয়। এমনকি তাদের পোষা ইংলিশ বুলডগ কুকুরটিকেও ম্যাচ চলাকালে রাখা হয় ঘরের বাইরে। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড থাকায় ব্যতিক্রম হিসেবে তাকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে রাখা হয়েছিল, তবে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে রোদ-বৃষ্টি যাই হোক না কেন, তাকে ঘরের বাইরেই থাকতে হবে।

অন্যদিকে, গ্রাসিয়েলা কাম্পোসের বাড়িতে ম্যাচ শুরু হলেই তার শাশুড়িকে চলে যেতে হয় রান্নাঘরে। সেখানে বসে তিনি আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা রঙের একটি স্কার্ফ বুনতে থাকেন। পরিবারটির বিশ্বাস, এই চিরাচরিত নিয়ম ভাঙা মানেই দলের জন্য অমঙ্গল ডেকে আনা।

সাধারণ সমর্থকদের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই-ও নিজের সৌভাগ্যের রুটিন ভাঙতে নারাজ। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের একটি ম্যাচও তিনি রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবনের বাইরে বসে দেখবেন না।

আর্জেন্টাইনদের এই আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী দিয়েগো মুরসি বলেন, আর্জেন্টিনায় ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সমর্থকেরা নিজেদের কেবল দর্শক মনে করেন না, বরং দলেরও অংশ ভাবেন। তাদের বিশ্বাস, এসব রীতিনীতি কঠোরভাবে মেনে চলার মাধ্যমে তারাও দলের জয়ে অবদান রাখছেন এবং দুর্ভাগ্যকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।

মুরসি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি কোচ কার্লোস বিলার্দোর একটি বিখ্যাত কুসংস্কারের গল্পও স্মরণ করিয়ে দেন। সেবার প্রথম ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমের একটি ফোন বেজে উঠেছিল। এক খেলোয়াড় ফোনটি ধরলেও ওপাশ থেকে কেউ কথা বলেনি। সেই ম্যাচ জেতার পর বিলার্দো পরবর্তী প্রতিটি ম্যাচের আগে একই খেলোয়াড়কে দিয়ে সেই ফোন ধরাতেন এবং ওপাশে বরাবরের মতোই কেউ কথা বলত না। কোচের বিশ্বাস ছিল, এই বিশেষ নিয়মটিই দলকে সৌভাগ্য এনে দিচ্ছে।

৭৪ বছর বয়সী লিদিয়া ওতেরোও বিশ্বাস করেন, তার সৌভাগ্যের কৌশল কখনো ভুল হয় না। তার ভাষ্যমতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের প্রথমার্ধে তাদের পোষা কুকুরটি টেলিভিশনের দিকে মুখ করে বসে ছিল, তাই গোল পাচ্ছিল না আর্জেন্টিনা। বিরতির পর কুকুরটির মুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার পরেই নাকি বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।

এছাড়া ২০২০ সালে মারা গেলেও দিয়েগো ম্যারাডোনা এখনো আর্জেন্টাইনদের বিশ্বাস ও আবেগের বড় একটি অংশ জুড়ে আছেন। ম্যাচের আগে বুয়েনস আইরেসে তার পুরোনো বাড়িতে ভিড় করছেন শত শত ভক্ত। অনেকে আবার প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের ছবি বা স্টিকার ফ্রিজারে রেখে দিচ্ছেন। তাদের বিশ্বাস, এতে প্রতিপক্ষের ভাগ্যও যেন ‘জমে’ যায়। ১১ বছর বয়সী মেসিভক্ত রদ্রিগো সের্না জানায়, এই রেওয়াজটি সে তার দাদার কাছ থেকে শিখেছে।

বিজ্ঞান হয়তো এসব বিশ্বাসকে স্বীকৃতি দেয় না, কিন্তু কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের কাছে এগুলো নিছক অন্ধবিশ্বাস নয়; বরং প্রিয় দলের জয়ে ভূমিকা রাখার এক পরম অনুভূতি। তাই স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালের আগে মাঠের উত্তেজনার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার প্রতিটি ঘরে ঘরেও চলছে সৌভাগ্য ধরে রাখার এক নীরব লড়াই।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।