ফরিদপুরে মামা-ভাগিনার রহস্যজনক মৃত্যু: লাশ উত্তোলনের এক বছরেও মেলেনি প্রতিবেদন

মিজানুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ
৮ জুলাই, ২০২৬ ৫:১৬ পিএম
শেয়ার করুন:
ফরিদপুরে মামা-ভাগিনার রহস্যজনক মৃত্যু: লাশ উত্তোলনের এক বছরেও মেলেনি প্রতিবেদন

ফরিদপুরের নগরকান্দায় রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার মামা-ভাগিনার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। এতে দীর্ঘায়িত হচ্ছে মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া, যার ফলে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে দ্রুত ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন নিহতদের স্বজনরা।

এর আগে, মৃত্যুর প্রায় ১ বছর ৪ মাস পর আদালতের নির্দেশে কবর থেকে ওই মামা-ভাগিনার মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছিল অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

নিহতরা হলেন—নগরকান্দা উপজেলার তালমা চরপাড়া গ্রামের বাবলু মিয়ার ছেলে মোখলেছুর রহমান মিয়া (৪৫) এবং একই উপজেলার জগদিয়া বালিয়া গ্রামের সিহাব উদ্দিনের ছেলে নাসির উদ্দিন (১১)। সম্পর্কে তাঁরা আপন মামা-ভাগিনা।

ঘটনার বিবরণ ও রহস্যজনক মৃত্যু

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ এপ্রিল সকালে মোখলেছুর রহমান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে তাঁকে স্থানীয় তালমা বাজারের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে স্যালাইন ও ওষুধ দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ওই দিনই তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে তিনি মারা যান।

এদিকে, এই ঘটনার তিন দিন আগে নানাবাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে ফেরা ভাগিনা নাসির উদ্দিনও ওই দিন বিকেলে প্রায় একই রকম উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরদিন সকালে শিশুটির শরীরে চামড়ার নিচে রক্ত জমাট বাঁধার মতো কালো দাগ দেখা দিলে তাকেও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ এপ্রিল সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে নাসিরেরও মৃত্যু হয়। পরে দুজনের মরদেহ নিজ নিজ এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মামলা ও লাশ উত্তোলন

মৃত্যুর পেছনে পরিকল্পিত হত্যার সন্দেহ প্রকাশ করে ২০২৪ সালের ৯ জুন ফরিদপুরের নগরকান্দা আদালতে একটি সিআর মামলা (মামলা নং-১৯৮/২৪) দায়ের করেন মোখলেছুর রহমানের মা আনোয়ারা বেগম। মামলার প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে দাফনের প্রায় এক বছর চার মাস পর কবর থেকে দুজনের মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যায় সিআইডি।

মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা আবুল হোসেন। তবে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ উত্তোলনের প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা সম্ভব হয়নি।

তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য

এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির পরিদর্শক আবুল হোসেন বলেন, "নিহত দুজনের মরদেহ থেকে সংগৃহীত ভিসেরা পরীক্ষার জন্য ঢাকার মহাখালীর পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে সেই রিপোর্ট এখনো আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। মহাখালী থেকে ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদন পেলেই দ্রুত আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।"

বাদী ও পরিবারের অভিযোগ

মামলার বাদী ও মোখলেছুর রহমানের মা আনোয়ারা বেগম (৫২) অভিযোগ করে বলেন, "আমার ছেলে মোখলেছুর রহমানের প্রথম স্ত্রী সুমী বেগমের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বিরোধ চলছিল। মোখলেছুর দ্বিতীয় বিয়ে করার পর সেই বিরোধ আরও চরম আকার ধারণ করে। আমাদের সন্দেহ, ওই বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে আমার ছেলে ও নাতিকে খাবারের সঙ্গে ধীরগতির বিষ বা কোনো ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে।"

এ ঘটনায় সুমী বেগম ও তাঁর বাবা আব্দুর রহিম মাতুব্বরকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে উল্লেখ করে আনোয়ারা বেগম আরও বলেন, "আমি আমার ছেলে ও নাতি হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। আদালতের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, যেন এই ঘটনার দ্রুত রহস্য উন্মোচন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়।"

নিহত শিশু নাসিরের মা নাজমা বেগম বলেন, "আমার ভাই মোখলেছুর ও আমার সন্তান নাসিরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমরা এই নৃশংস ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"

উল্লেখ্য, মামলার পর থেকে অভিযুক্ত আসামিরা পলাতক থাকায় এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন রয়েছে। সিআইডির তদন্ত ও ভিসেরা পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এ ঘটনার পেছনের সত্যতা জানা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।