বিএনপি সরকারের ১০০ দিন, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
একটি বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ ও নানা চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণ এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে সরকারকে।
সরকারের ১০০ দিনের পথচলা
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকেই নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের চাপের মুখে পড়ে বিএনপি। এর ওপর জ্বালানি সংকট ও হাম পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ বছরের মেয়াদে ১০০ দিন খুব সামান্য সময় হলেও, এই সময়ে নেওয়া পদক্ষেপগুলো সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার একটি ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক সংস্কার: বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার নাম ‘অর্থনীতি’। ব্যাংক খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সময়কাল ছিল মূলত ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ বা সংকট মোকাবিলার সময়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক ঋণের মতো উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, আসন্ন বাজেট সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ এবং ছিনতাইয়ের মতো ঘটনায় জনমনে অস্বস্তি রয়ে গেছে। পুলিশ বাহিনীকে পূর্ণ পেশাদারিত্বে ফেরানো এবং অপরাধ দমনে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।’ তবে সরকার মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির মতো ঘটনা রোধে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সুশাসন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান মনে করেন, সরকার এখন পর্যন্ত বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে পেরেছে। জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও সংবিধান সংস্কার পরিষদসহ কিছু বিষয় নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে কিছুটা উত্তাপ বিরাজ করছে।
সরকারের ভাষ্য: সাফল্যের ফিরিস্তি
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, গত ১০০ দিনে মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়া পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এবং এস আলম গ্রুপের সম্পদ জব্দের মাধ্যমে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
কৃষি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল 'কৃষক কার্ড' চালু এবং পল্লবীর শিশু হত্যাসহ গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করাকে সরকার নিজেদের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ৬০৪ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ ও টিকাদান কর্মসূচিকেও তারা গুরুত্বের সাথে নিয়েছে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন ছিল সংকট উত্তরণের লড়াই। সাধারণ মানুষের কাছে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন এবং টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কারই এখন সবচেয়ে বড় প্রতীক্ষিত বিষয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিলেই দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ