মধ্যপ্রাচ্যে ‘সিসিফাসের ফাঁদে’ যুক্তরাষ্ট্র: নেপথ্যে চীনের কৌশলী কূটনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

অনলাইন ডেস্কঃ
১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৫৮ পিএম
শেয়ার করুন:
মধ্যপ্রাচ্যে ‘সিসিফাসের ফাঁদে’ যুক্তরাষ্ট্র: নেপথ্যে চীনের কৌশলী কূটনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ের অবস্থান এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশেষ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে এই যুদ্ধাবস্থায় ওয়াশিংটন এক অন্তহীন ‘সিসিফাসের ফাঁদে’ আটকা পড়েছে এবং চীন পর্দার আড়াল থেকে নিজের স্বার্থ হাসিলে অত্যন্ত সতর্ক চাল দিচ্ছে।

ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে চীনের ভূমিকা ছিল অবাক করার মতো নীরব। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু বা তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা খামেনির নির্বাচন—কোনো কিছুতেই বেইজিং বাড়তি আবেগ দেখায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, চীন নিজেকে একাধারে ‘শান্তি স্থাপনকারী’ এবং ‘দায়িত্বশীল পরাশক্তি’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চায়। তারা ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলাই এখন শ্রেয় মনে করছে।

চীনের প্রধান মাথাব্যথা এখন বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে। ইরানের তেলের বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা চীনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপ করলে চীন একে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ পদক্ষেপ বলে কঠোর সমালোচনা করেছে। বেইজিং মনে করে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে এবং তেলের বাজারকে অস্থির করে তুলছে।

গ্রিক পুরাণের সিসিফাসের মতো যুক্তরাষ্ট্রও মধ্যপ্রাচ্যে এক নিষ্ফল ও অন্তহীন শ্রমের চক্রে জড়িয়ে পড়েছে—যাকে বলা হচ্ছে ‘সিসিফাস ট্র্যাপ’। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিনহুয়া মনে করিয়ে দিয়েছে যে, একমাত্র পরাশক্তি হয়েও সবকিছু ধ্বংস করা বা মানুষ হত্যা করা সম্ভব হলেও, বহুমুখী বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর সম্ভব নয়। বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে সাজাতে গিয়ে নিজের সম্পদ ও সুনামই কেবল ক্ষয় করছে।

চীন এই অঞ্চলে সরাসরি কোনো পক্ষ নিতে আগ্রহী নয়। একদিকে ইরানের সাথে অংশীদারত্ব, অন্যদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখছে বেইজিং। মজার বিষয় হলো, ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে বা মধ্যস্থতা করতে চীন সরাসরি না জড়িয়ে পাকিস্তানকে একটি ‘নিরাপদ মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি মূলত কোনো ব্যর্থতার দায়ভার নিজের কাঁধে না নেওয়ার একটি কৌশলী পদক্ষেপ।

প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতা দেখালেও কিছু গোয়েন্দা তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, চীন ইরানকে উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে, যা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সক্ষম। এছাড়া আকাশপথে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর গুঞ্জনও রয়েছে। যদিও বেইজিং এসব দাবি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

আগামী মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা নেতা সি চিন পিংয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। চীন চায় না ইরান ইস্যু তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলুক। তবে ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এই বৈঠককে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবা খেলায় চীন এখন ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে। যুদ্ধের উত্তাপ থেকে দূরে থেকে একদিকে যেমন নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা রক্ষা করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ক্ষয়ের দৃশ্যটি উপভোগ করছে বেইজিং। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ এশিয়া তথা বিশ্বের নেতৃত্ব কার হাতে তুলে দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।