চিৎমরম সাংগ্রাইয়ের রঙে রঙিন পাহাড় ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলায় দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের প্রধান সামাজিক উৎসব 'বৈসাবি'র রঙে এখন রঙিন পাহাড়। এরই ধারাবাহিকতায় রাঙ্গামাটি কাপ্তাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধ বিহার মাঠ প্রাঙ্গণে মারমা সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ উৎসব 'সাংগ্রাই' উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছে গ্রামবাংলার জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা। মারমা সংস্কৃতির কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই এই বিশেষ আয়োজন।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বিকেলে কাপ্তাইয়ের বুদ্ধ বিহার সংলগ্ন মাঠে এই খেলার আয়োজন করা হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, রঙিন পোশাকে সজ্জিত তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো এলাকা এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। মারমা যুবকদের সাহসিকতা ও শক্তির প্রদর্শনী হিসেবে পরিচিত এই হাডুডু খেলা দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকশ দর্শক সমবেত হন। মাঠের চারপাশে দর্শকদের করতালিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সাংগ্রাই মূলত মারমা সম্প্রদায়ের নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার উৎসব। জল কেলির (পানি খেলা) পাশাপাশি বিভিন্ন খেলাধুলা এই উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আয়োজক কমিটির আহবায়ক উথোয়াইমং মারমা পক্ষ থেকে জানানো হয়,
"আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। সাংগ্রাইয়ের এই শুভ ক্ষণে হাডুডু খেলার মাধ্যমে আমরা একদিকে যেমন আনন্দ করছি, অন্যদিকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।"
চরম উত্তেজনাপূর্ণ এই খেলা উপজেলার বিভিন্ন পাড়া ও গ্রাম থেকে আসা একাধিক দল অংশগ্রহণ করে। দম নেওয়া আর প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে ছোঁয়ার এই লড়াইয়ে খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য ছিল দেখার মতো। হাডুডু ছাড়াও এদিন হাড়ি ভাঙা, রশি টানাটানি, লাটিম এবং ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলার আয়োজন করা হয়। খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
উপস্থিত অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, এ ধরনের আয়োজন কেবল মারমা সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পাহাড়ের সকল জাতিসত্তার মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করে। সাংগ্রাইয়ের এই আনন্দ যেন সারা বছর পাহাড়ে শান্তি ও সংহতির বার্তা বয়ে আনে।
আজ সন্ধ্যায় বুদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে প্রদীপ প্রজ্বলন ও বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি সমাপ্ত হয়। আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, উৎসবের দ্বিতীয় দিনে আগামীকাল অনুষ্ঠিত হবে বর্ণাঢ্য 'সাংগ্রাই র্যালি'। এরপর অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ ও সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা শেষে শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত 'জল কেলি' বা মৈত্রী পানিবর্ষণ উৎসব।
দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একুস্টিক ব্যান্ড শো, লটারি এবং ঐতিহ্যবাহী যাত্রা পালার মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা চলবে। এরপর আগামী কয়েকদিন পাড়ায় পাড়ায় চলবে মৈত্রী পানিবর্ষণ ও মারমা সংস্কৃতির নানা আয়োজন।
What's Your Reaction?
রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ