কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার চিন্তা

অনলাইন ডেস্কঃ
২২ মে, ২০২৬ ১২:১৪ পিএম
শেয়ার করুন:
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার চিন্তা

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। মূলত জমি, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজারমূল্য আড়াল করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে এবং এই খাত থেকে রাজস্ব বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।

কেন এই উদ্যোগ?
এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে স্থাবর সম্পদ কেনাবেচার একটি বিশাল অংশ করজালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো সরকারি ‘মৌজা মূল্য’ এবং প্রকৃত ‘বাজারমূল্যের’ মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। 

উদাহরণস্বরূপ, রাজধানীর গুলশান বা বনানীতে ১০ কোটি টাকায় একটি জমি বিক্রি হলেও সরকারি মৌজা রেট অনুযায়ী তার দলিল হয় মাত্র ২ কোটি টাকায়। ফলে বিক্রেতার হাতে থাকা বাকি ৮ কোটি টাকার কোনো বৈধ উৎস বা প্রমাণ থাকে না। এই বিশাল অঙ্কের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘কালো টাকা’ হিসেবে গণ্য হয় এবং অর্থনীতির মূল স্রোতে ঢুকতে পারে না। এই প্রাতিষ্ঠানিক ‘মিথ্যা ঘোষণা’ থেকে বেরিয়ে আসতেই নতুন বাজেটে বিশেষ সুযোগ রাখা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত শর্তাবলি

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এবারের সুযোগটি হবে শর্তসাপেক্ষে। 
১. ক্রেতা এবং বিক্রেতা—উভয়কেই তাদের আয়কর রিটার্নে সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য ঘোষণা করতে হবে। 
২. নির্ধারিত হারে কর পরিশোধের মাধ্যমে এই অর্থ বৈধ করা যাবে। 
৩. নিয়মিত করদাতাদের তুলনায় এক্ষেত্রে করের হার কিছুটা বেশি হতে পারে। 
৪. এমনকি বিদেশে থাকা অপ্রদর্শিত সম্পদও নির্দিষ্ট শর্তে দেশে ফিরিয়ে আনার বা বৈধ করার সুযোগ থাকতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
আবাসন খাতের সংগঠন **রিহ্যাব**-এর সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, অনেক প্রবাসী বা দেশে থাকা নাগরিকরা অলস অর্থ রিটার্নে দেখাতে না পেরে বিদেশে পাচার করে দেন। আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে এই টাকা দেশে থাকবে এবং খাতটি চাঙ্গা হবে।

অন্যদিকে, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা **পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ**-এর চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেন, "দুর্নীতি বা অনৈতিক উপায়ে উপার্জিত অর্থকে কোনোভাবেই সাদা করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তবে যারা কর ব্যবস্থার জটিলতা বা কারিগরি কারণে অর্থ প্রদর্শন করতে পারেননি, তাদের জরিমানা ও উচ্চহারে কর দিয়ে বৈধ হওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।" তিনি আরও পরামর্শ দেন যে, মৌজা রেটকে বাজারমূল্যের কাছাকাছি নিয়ে আসাই হবে এই সমস্যা সমাধানের দীর্ঘমেয়াদী পথ।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের আমলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ায় সুযোগটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও, বর্তমানে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় আবারও তা চালুর কথা ভাবছে সরকার।

তবে কর কর্মকর্তাদের মতে, কেউ যদি এই বিশেষ সুবিধার অপব্যবহার করে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও বাজেটে রাখা হতে পারে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।