যুদ্ধ বন্ধ হলেও আমরা জ্বালানি সংকট থেকে মুক্ত হব না: অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম
বাংলাদেশে চলমান জ্বালানি সংকট কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা ‘লুটপাটমুখী উন্নয়ন’ ও কাঠামোগত দুর্নীতির ফল—এমনটাই মনে করেন দেশের প্রখ্যাত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। সম্প্রতি ‘আজকের পত্রিকা’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের জ্বালানি খাতের গভীর সংকট, অব্যবস্থাপনা এবং বর্তমান সরকারের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
ইরানে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরুর পরপরই দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিলেও সরকার তা অস্বীকার করে আসছে। এ প্রসঙ্গে ড. আলম বলেন, "মন্ত্রী যখন বলেন ঘাটতি নেই, তখন তিনি হয়তো মজুত তেলের হিসাব দেন। কিন্তু বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কের ফলে যে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে, তা তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন।" তিনি জানান, বর্তমানে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে এবং কালোবাজারিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে জ্বালানি বাজার। ট্রাকচালকদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও সহিংসতার ঘটনা সংকটের তীব্রতাকেই প্রমাণ করে।
অধ্যাপক আলমের মতে, জ্বালানি সংকটের জন্য যুদ্ধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, "যুদ্ধ সংকটের মাত্রা কিছুটা বাড়ালেও আসল সমস্যা হলো বিগত বছরগুলোর লুণ্ঠনমুখী জ্বালানি নীতি। এলএনজি নির্ভরতা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছে। চড়া দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করার নামে জনগণের পকেট কাটা হয়েছে।" তাঁর দাবি, বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি খাতকে এক শ্রেণির ‘অলিগার্ক’ বা সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছিল।
সাক্ষাৎকারে তিনি রূপপুর ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তিনি জানান, চুরির ধরণ বদলেছে। আগে ক্ষুদ্র পর্যায়ে চুরি হতো, আর এখন বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা তছরুপ করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সাতক্ষীরা ও খুলনায় শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্যাস পাইপলাইন কোনো কাজেই আসছে না। আবার বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করে মাগনামা-২ কূপে খননকাজ চালিয়ে শত কোটি টাকা জলে ফেলা হয়েছে।
বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলেও জ্বালানি খাতে কার্যকর পরিবর্তনের অভাব লক্ষ্য করছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:
১. বাপেক্সকে কাজে লাগানো: নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে ছাতক ইস্ট গ্যাস কূপ থেকে দ্রুত গ্যাস উত্তোলনের নির্দেশ দিতে হবে।
২. ভোলার গ্যাস ব্যবহার: ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে, যাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমে।
৩. বিদ্যুতের দাম কমানো: কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করলে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা কমানো সম্ভব।
৪. কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পূর্ণ ব্যবহার: ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স বাতিল করে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় (৮০-৯০ শতাংশ) চালাতে হবে। এতে আদানির বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতাও কমবে।
ড. শামসুল আলম সতর্ক করে বলেন, সরকারের দর্শন যদি লুণ্ঠন বজায় রাখা হয়, তবে কোনো সংস্কারই কাজে আসবে না। সরকারকে ‘মুনাফাখোর’ মানসিকতা ত্যাগ করে গণশুনানির মাধ্যমে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের আহ্বান জানান তিনি। তিনি মনে করেন, এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে জ্বালানি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ