উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি যে গ্রামে, দুই কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্কুলে যায় শিশুরা
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত জনপদ গোবিন্দপুর ও দুর্গাপুর দুটি গ্রামের নাম। মানচিত্রে ছোট্ট দুটি বিন্দু হলেও এই গ্রামের মানুষের সংগ্রাম যেন দীর্ঘ এক কষ্টের ইতিহাস। বর্ষায় চারদিকে থৈ থৈ পানি, আর গ্রীষ্মের দুপুরে খা খা রোদ—এই প্রকৃতির দুই চরম রূপের মাঝেই প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে কয়েক হাজার মানুষ।
এই দুই গ্রামের কোমলমতি শিশুরা প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা এবং আরও এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যায়। বর্ষা মৌসুমে যখন একমাত্র চলাচলের কাঁচা রাস্তাটি পানিতে তলিয়ে যায়, তখন অনেক সময় তাদের ভরসা হয় ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা। ভিজে কাদামাটির পথ, পা পিছলে পড়ার ভয়, আর বই-খাতা বাঁচানোর চেষ্টা এসব নিয়েই তাদের স্কুলযাত্রা। আর গ্রীষ্মে? পুড়তে থাকা রোদ মাথায় নিয়ে হেঁটেই পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা নেই—হাঁটাই তাদের একমাত্র ভরসা।
জানা গেছে, গোবিন্দপুর গ্রামে ব্র্যাক পরিচালিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্লে-নার্সারি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এরপর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হলে শিশুদের যেতে হয় প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের সাড়ুকদিয়া এলাকায়। প্রতিদিনের এই যাত্রা যেন ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। অনেক সময় প্রতিকূলতার কাছে হার মেনে স্কুল ফাঁকি দিতেও বাধ্য হয় তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, উন্নয়নের ছোঁয়া এখানে এখনও পৌঁছায়নি। সামান্য বৃষ্টি হলেই কাঁচা রাস্তা কাদায় পিচ্ছিল হয়ে ওঠে, চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো সুব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ সেবা থাকলেও রাস্তা, সেতু, চিকিৎসা বা যোগাযোগ ব্যবস্থায় নেই দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন। ভোগান্তি যেন এই দুই গ্রামের মানুষের নিত্যসঙ্গী।
গোবিন্দপুর গ্রামের আইয়ুব খানের বাড়ি থেকে দুর্গাপুরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা এখনও কাঁচা। এই পথে নেই কোনো যানবাহনের চলাচল। হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে দুই গ্রামের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা তাদের জীবনকে করে তুলেছে কঠিন। রাস্তার অভাবে শিশুরা সময়মতো স্কুলে যেতে পারে না, অসুস্থরা সময়মতো চিকিৎসা পায় না।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহফুজ খান, জাকির হোসেন ও গোলাম আলী খান জানান, আটঘর ইউনিয়নের খাগৈড় ব্রিজ থেকে কড়াইবাড়িয়া দুর্গাপুর পর্যন্ত এক কিলোমিটার এইচবিবি রাস্তা থাকলেও বাকি প্রায় দেড় কিলোমিটার এখনও পাকা হয়নি। এতে দুই গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। তারা দ্রুত রাস্তাটি পাকাকরণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
দুর্গাপুর গ্রামের জগদীশ বাড়ৈ ও ঝর্না রানী বলেন, কড়াইবাড়িয়া দুর্গাপুর মৌজার অধিকাংশ বাসিন্দাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। এখানে নেই কোনো উপযুক্ত যান চলাচলের রাস্তা। পাকা রাস্তার অভাবে শিশুদের স্কুল-কলেজে যেতে দেরি হয়, অনেক সময় যাওয়া সম্ভবই হয় না। চিকিৎসা, বাজার বা অন্যান্য সেবাও তাদের কাছে যেন দূরের স্বপ্ন। দ্রুত রাস্তাটি পাকাকরণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
উন্নয়নের গল্পে যখন দেশ এগিয়ে যাওয়ার কথা শোনা যায়, তখন গোবিন্দপুর ও দুর্গাপুরের মানুষও চায় সেই অগ্রযাত্রার অংশ হতে। তারা চায় একটি পাকা রাস্তা—যে রাস্তা দিয়ে শিশুরা নিশ্চিন্তে স্কুলে যাবে, অসুস্থ মানুষ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাবে, আর গ্রাম দুটির মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। উন্নয়নের আলো কবে পৌঁছাবে এই প্রত্যন্ত জনপদে—সেই অপেক্ষায় দিন গুনছে দুই গ্রামের হাজারো মানুষ।
এ বিষয়ে সালথা উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আবু জাফর মিয়া বলেন, গোবিন্দপুর ও দুর্গাপুর গ্রামের রাস্তার বিষয়টি তার জানা আছে। এখানে এক কিলোমিটার রাস্তা এইচবিবি করা হয়েছে। বাকি প্রায় ১.২০ কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণ এবং মাঝখানে একটি কালভার্ট নির্মাণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।
What's Your Reaction?
জাকির হোসেন, স্টাফ রিপোর্টারঃ