জামায়াত আমিরের জালিয়াত উপদেষ্টা ভোল পাল্টানো মাহামুদুল এক মহাপ্রতারক
ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে প্রতারণার জাল বিছিয়ে আসছেন মাহামুদুল হাসান নামের এক ব্যক্তি। নিজেকে কখনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার উপদেষ্টা, আবার কখনো জামায়াতে ইসলামীর আমিরের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি নীতিনির্ধারণী মহলে প্রভাব খাটিয়েছেন। কিন্তু তার এই চটকদার আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিকৃত ও অপরাধী সত্তা।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জালিয়াতির শুরু
মাহামুদুল হাসানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ঢাকা ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পর্যন্ত। অথচ তিনি নিজের নামের আগে ‘প্রফেসর’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি দাবি করে ‘ড.’ পদবি ব্যবহার করে আসছিলেন। এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি নর্থ সাউথ ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর মতো নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি সেখানে বিবিএতে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রতারণায় হাতেখড়ি হওয়া মাহামুদুল লন্ডনে পাড়ি জমিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে ভুয়া সনদ বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া ‘ই-ফাইভ-কাউন্সিল’ নামে একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠন খুলে নিজেকে চেয়ারম্যান পরিচয় দিতেন এবং মন্ত্রী-এমপিদের কাছে বিদেশি ডেলিগেট আনার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে শিডিউল হাতিয়ে নিতেন। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় যুক্তরাজ্যে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা (ব্যান) জারি করা হয়।
রাজনৈতিক পরিচয় বদল ও ক্ষমতার অপব্যবহার
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাহামুদুল রাতারাতি ‘কট্টর আওয়ামী লীগার’ সেজে যান। নিজেকে শেখ হাসিনার উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে তিনি ‘প্রিমিয়াম পাস লিমিটেড’ ও ‘পিএপি ইন্টারন্যাশনাল’ নামে এনজিওর আড়ালে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লবিং ও অর্থবাণিজ্য শুরু করেন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কারক সেজে প্রতারণা শুরু করেন এবং একপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে জায়গা করে নেন। তবে ভুয়া নথিপত্র ও জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় জামায়াত তাকে অব্যাহতি দেয়।
বিকৃত যৌনাচার ও পারিবারিক ধ্বংসযজ্ঞ
ব্যক্তিজীবনে মাহামুদুল চরম বিকৃত মানসিকতার অধিকারী। শ্বশুরবাড়িতে থাকাকালীন ১৫ বছর বয়সী এক গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণের দায়ে তিনি জেল খেটেছেন। জামিনে বের হয়ে তিনি সাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে বিচার থেকে রেহাই পান। তার সাবেক স্ত্রী ও সন্তানদের ওপরও তিনি ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন। এমনকি নিজের ১৬ বছরের সন্তান ও সাবেক স্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে হয়রানি করার মতো জঘন্য অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
সংস্কার কমিশনের দাবির সত্যতা নেই
মাহামুদুল দাবি করেছেন তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ২০টি সংস্কার কমিশনে কাজ করছেন। অথচ সরকারি সংস্কার কমিশনগুলোর সদস্যদের তালিকায় তার কোনো অস্তিত্বই নেই। প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম তাকে চেনেন না বলে নিশ্চিত করেছেন।
সব প্রশ্নের মুখে নীরবতা
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে বারবার চেষ্টা করা হলেও মাহামুদুল হাসান কোনো মন্তব্য করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানোর পরও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
প্রতারণা, জাল জালিয়াতি এবং জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত মাহামুদুল হাসান এতদিন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পার পেয়ে গেলেও, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার দীর্ঘদিনের অপকর্মের চিত্র এখন জনগণের সামনে স্পষ্ট।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ