রুমায় সাংগ্রাই উৎসবের মহাপ্রস্তুতি: সাঙ্গুর চরে সাজ সাজ রব
দুপুরের প্রখর রোদ উপেক্ষা করেই চলছে উৎসবের প্রস্তুতি। কারো হাতে বাঁশের তর্জা, কারো হাতে কঞ্চি। নিজেদের কায়িক শ্রমে দল বেঁধে কেউ তৈরি করছেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ, কেউ আবার বানাচ্ছেন আমন্ত্রিত অতিথি ও শিল্পীদের বিশ্রামের জন্য মাচাং ঘর। সাঙ্গু নদের তীরে চলছে ফটো সেশনের বিশেষ মাচাং ও স্থানীয় জীবন-জীবিকার প্রদর্শনী গ্যালারি তৈরির কাজ। মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসব 'মাহা সাংগ্রাই পোয়ে-২০২৬' উপলক্ষে বান্দরবানের রুমা উপজেলার পলিকা পাড়ায় এখন এমনই এক উৎসবমুখর কর্মযজ্ঞ চলছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) সরেজমিনে পলিকা পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, আগামী ১৭ এপ্রিলের মূল উৎসবকে ঘিরে গত এক সপ্তাহ ধরে ব্যস্ত সময় পার করছেন পাড়াবাসী। রুমা সদর ইউনিয়নের এই পাড়াটিতে এবার আয়োজন করা হচ্ছে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা।
পলিকা পাড়া সাংগ্রাই পোয়ে উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও স্থানীয় মেম্বার মংমিন মারমা জানান, আগামী ১৭ এপ্রিল দুপুর ২টা থেকে শুরু হবে মূল অনুষ্ঠান। কর্মসূচির প্রথম ধাপে রয়েছে সাংগ্রাইয়ের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা ও মৈত্রী পানিবর্ষণ বা ‘জলকেলি’ উৎসব। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কেএসমং-এর।
দ্বিতীয় ধাপে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। যেখানে গান পরিবেশন করবেন দেশের জনপ্রিয় মারমা শিল্পী আইডল মং ও আঞ্চলিক গানের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী চিংক্য এ। এছাড়াও স্থানীয় ও আমন্ত্রিত শিল্পীদের নাচ-গানে মুখরিত হবে সাঙ্গু নদের তীর।
উৎসবের তৃতীয় ও আকর্ষণীয় অংশ হিসেবে রাত ১০টার পর থেকে সারারাতব্যাপী পরিবেশিত হবে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী লোকজ নাট্য ‘পাংখুং’। রাম-লক্ষ্মণের গল্প অবলম্বনে এই 'রাম্মা পাংখুং' নৃত্য উপভোগ করতে ভিড় জমাবেন দূর-দূরান্তের মানুষ।
আয়োজকরা জানান, পুরো অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি অনুদানে এই ব্যয়ভার মেটানো কঠিন হওয়ায় পলিকা পাড়ার নারী-পুরুষ ও যুবসমাজ এক সপ্তাহ ধরে নিজেদের কায়িক শ্রমে মাঠ ও মঞ্চ তৈরির কাজ করছেন।
কাজের ফাঁকে কথা হলো ১৯-২০ বছর বয়সী তরুণী শৈসাইনু ও মেসাইউ-এর সাথে। তারা জানান, পুরুষেরা সকাল থেকে রাত অবধি মঞ্চ ও ঘর তৈরির কাজ করছেন। তারা যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারেন, সেজন্য পাড়ার নারীরা মিলে নদীর ধারের অস্থায়ী রান্নাঘরে তাদের জন্য দুপুরের খাবার, চা ও নাস্তা তৈরি করছেন। নিজেদের উৎসবে এভাবে শামিল হতে পেরে তারা বেশ আনন্দিত।
পলিকা পাড়া সাংগ্রাই পোয়ে উদযাপন কমিটির সভাপতি ও ৩৫৩নং কোলাদি মৌজার হেডম্যান শৈচিংথুই মারমা বলেন, "আগামী ১৩ এপ্রিলের মধ্যে প্রস্তুতির সব কাজ শেষ হবে। আমরা মারমা সম্প্রদায়সহ সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে এই আনন্দ উৎসবে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। অনুষ্ঠানটি যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্য উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি।"
পাহাড়ের এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে সাঙ্গু নদীর চরে এখন বইছে আনন্দের হাওয়া, যা পূর্ণতা পাবে ১৭ এপ্রিলের বর্ণিল আয়োজনে।
What's Your Reaction?
শৈহ্লাচিং মারমা, রুমা প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ