জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
Apr 11, 2026 - 12:21
জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে

জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও সাংবিধানিক রূপরেখা বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজের দায়বদ্ধতা শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। 'সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স' (সিআইপিজি)-এর উদ্যোগে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে শনিবার (১১ এপ্রিল) এই সেমিনারটি আয়োজিত হয়।

সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. বেলায়েত হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (অব:) ও সিআইপিজি-এর চেয়ারম্যান ড. মো: মোজাম্মেল হক।

মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কোনো সাধারণ ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল ১৫ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তিনি যুক্তি দেন যে, এই পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হলো ‘General Will’ বা জনগণের ইচ্ছা। সংবিধানের বাইরে গিয়েও যখন কোনো বিপ্লব সফল হয়, তখন জনগণের আকাঙ্ক্ষাই হয়ে ওঠে নতুন আইনি কাঠামোর মূল উৎস। এই প্রেক্ষাপটেই ‘জুলাই সনদ’ ও ‘জুলাই আদেশ ২০২৫’ প্রণীত হয়েছে, যা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দান করে।

সেমিনারে বক্তারা নবনির্বাচিত সংসদের কিছু সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা সংস্কার প্রক্রিয়ার পথে অন্তরায় হতে পারে। বিশেষ করে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ বাতিলের সমালোচনা করে বলা হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষায় এই আইনগুলো ছিল অপরিহার্য। বক্তারা বলেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করার যে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, তা যেন কোনো রাজনৈতিক কৌশলের বলি না হয়।

সেমিনারে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ও অধ্যাপক আবদুর রবসহ অন্যান্য বিশিষ্ট আলোচকগণ বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের মধ্যে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা আইনি বাধ্যবাধকতা। তারা জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের পথরেখাটি কেবল কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না, বরং এর প্রতিটি অংশ বাস্তবায়নে সংসদ ও সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, নাগরিক সমাজকে কেবল পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকলে চলবে না, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আওতায় সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শমূলক এখতিয়ার এবং জুলাই আদেশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়।

সেমিনারে উপস্থিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একমত পোষণ করেন যে, জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো প্রয়োজন। সংস্কারের পথরেখা থেকে বিচ্যুত হওয়া হবে শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। তারা বর্তমান সংসদকে হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow