দোকান গুটিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না নান্নু মিয়ার: বেপরোয়া মোটরসাইকেলের বলি বৃদ্ধ ব্যবসায়ী
নিয়ম করে প্রতিদিন দোকান বন্ধ করে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতেন তিনি। রোববার রাত সাড়ে ৯টার সময়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু কে জানত, পরিচিত সেই পথই ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার প্রবীণ মুদি দোকানি নান্নু মিয়ার (৬৫) জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে। বেপরোয়া গতির এক মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ হারালেন সহজ-সরল এই মানুষটি।
সোমবার (২৫ মে) সকাল ১১টায় ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি। এর আগে রোববার রাতে বুড়াইচ নতুন বাজার এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত নান্নু মিয়া উপজেলার মালিডাঙ্গা গ্রামের মৃত ওহাব মিয়া ওরফে মাস্টারের ছেলে এবং দৈনিক সমকালের আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি ইকবাল হোসেনের আপন মামা। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বুড়াইচ নতুন বাজারে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মুদি ব্যবসা করে আসছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিলেন নান্নু মিয়া। এসময় পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগতির মোটরসাইকেল তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী রঞ্জু মিয়া সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, "বাইকটা যেন ছিল একটা পাগলা ঘোড়া। ধাক্কা দিয়ে নান্নু চাচাকে প্রায় ২০ হাত টেনে নিয়ে গেল। মুহূর্তেই রক্তে ভেসে গেল রাস্তা। এমন ভয়ংকর দৃশ্য আমি জীবনেও দেখিনি।"
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে আলফাডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা সিএমএইচ-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের কারণে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
এলাকাবাসীর কাছে অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন নান্নু মিয়া। তার অকাল প্রয়াণে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তিন ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে গড়া সাজানো সংসারে এখন কেবলই কান্নার রোল। মালিডাঙ্গা গ্রামের আকাশ-বাতাস আজ স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, এই ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, আলফাডাঙ্গার সড়কগুলোতে রাতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালকদের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করায় অকালে ঝরে যাচ্ছে নান্নু মিয়ার মতো সাধারণ মানুষের প্রাণ। প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্পিড ব্রেকার স্থাপন, রাতের টহল জোরদার এবং কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তাদের একটাই আকুতি—আর কোনো নান্নু মিয়াকে যেন দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে এভাবে অকালে থেমে যেতে না হয়।
What's Your Reaction?
কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ