মেটলাইফেই শুরু, মেটলাইফেই শেষ: চোখের জলে ব্রাজিল দলকে বিদায় বললেন নেইমার

অনলাইন ডেস্কঃ
৬ জুলাই, ২০২৬ ১০:৪৩ এএম
শেয়ার করুন:
মেটলাইফেই শুরু, মেটলাইফেই শেষ: চোখের জলে ব্রাজিল দলকে বিদায় বললেন নেইমার

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই একদিন শুরু হয়েছিল নেইমার জুনিয়রের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। আজ সেই একই ভেন্যুতে, নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শেষ হলো সেলেসাওদের জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ পথচলা। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে ব্রাজিলের বিদায়ের পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন এই মহাতারকা।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার। সতীর্থ রাফিনিয়াসহ অন্যরা তাঁকে সান্ত্বনা দিলেও ব্রাজিলের এই ‘নম্বর ১০’-এর চোখে-মুখে তখন একরাশ হতাশা আর দীর্ঘ অপূর্ণতার ছাপ। ম্যাচের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ব্রাজিলের গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি, অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজ সব শেষ হলো। যেখানে শুরু করেছিলাম, আজ সেখানেই শেষ করলাম।”

নেইমারের এই আবেগঘন বিদায়ের পেছনে রয়েছে এক দারুণ ঐতিহাসিক যোগসূত্র। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচ দিয়ে এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল তরুণ নেইমারের, যেখানে গোলও করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ১৬ বছর পর সেই একই ভেন্যুতে নরওয়ের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করলেন। তবে ১৬ বছর আগের গোলটি যেখানে ছিল এক নতুন যুগের সূচনা, আজকের গোলটি বয়ে নিয়ে এল কেবলই বিদায়ের করুণ সুর।

নরওয়ের বিপক্ষে বাঁচা-মরার এই ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন না নেইমার। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে যখন মাঠে নামেন, তখনও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলের হাতেই ছিল। কিন্তু শেষ দিকে নরওয়েজিয়ান তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোল ম্যাচের সমীকরণ বদলে দেয়। ম্যাচের ৭৮ ও ৮৯ মিনিটে গোল দুটি করেন হালান্ড। অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে নেইমার ব্যবধান কমালেও ব্রাজিলের পরাজয় ঠেকাতে তা যথেষ্ট ছিল না।

এই পরাজয়ের ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতেই থামল সেলেসাওদের যাত্রা। ১৯৯০ সালের পর এবারই প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। একই সঙ্গে ২০০২ সালের পর নকআউট পর্বে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়ের বন্ধ্যাত্ব আরও দীর্ঘায়িত হলো। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়ার পর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো নরওয়ের নাম।

দলের এই করুণ বিদায়ের পাশাপাশি নেইমারের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের সমাপ্তিও হয়ে রইল অত্যন্ত বেদনার। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—টানা চারটি বিশ্বকাপ খেলেও সোনালি ট্রফি ছুঁয়ে দেখা হলো না তাঁর। থিয়াগো সিলভার পর দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ খেলে ট্রফিহীন অবস্থায় বিদায় নিতে হলো এই তারকাকে।

তবে রেকর্ডের পাতায় পেলের পাশে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে নেইমারের নাম। নরওয়ের বিপক্ষে গোল করার মাধ্যমে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে পেলের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়লেন নেইমার। কিন্তু দলীয় ব্যর্থতার অন্ধকারে এই ব্যক্তিগত অর্জন যেন পুরোপুরি ম্লান হয়ে গেছে।

ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে নেইমারের পরিসংখ্যান সত্যিই ঈর্ষণীয়। ১৩০ ম্যাচে ৮০টি গোল এবং ৫৮টি অ্যাসিস্টের দুর্দান্ত এক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন তিনি। তবে সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে তাঁর একমাত্র বড় শিরোপা ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপ জয়। এছাড়া ২০১৬ অলিম্পিকে সোনা জিতলেও সেটি ছিল অনূর্ধ্ব-২৩ দলের টুর্নামেন্ট।

চমকপ্রদ ড্রিবলিং, দর্শনীয় গোল, মাঠের কান্না-বিতর্ক, অদম্য প্রত্যাশা, চোটের আঘাত কিংবা বারবার রাজার মতো ফিরে আসা—সব মিলিয়ে নেইমার ছিলেন এই প্রজন্মের ব্রাজিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। বিশ্বজয়ের ট্রফি হয়তো তাঁর হাতে ওঠেনি, কিন্তু ভক্তদের হৃদয়ে আর ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে তাঁর নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।