বিএনপি সরকারের ১০০ দিন: ভগ্ন অর্থনীতি ও জনপ্রত্যাশা পূরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ
বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর ১০০ দিন পূর্ণ করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষে এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে সাধারণ মানুষ এই পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে ছিল। সরকারের এই অল্প সময়ের পথচলায় কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেলেও ভঙ্গুর অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনদুর্ভোগ সামাল দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিবাচক শুরু ও মিতব্যয়িতার বার্তা
ক্ষমতায় এসেই সরকার কিছু জনবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নে খাল খনন কর্মসূচি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, অতীতের প্রথা ভেঙে বিএনপির সংসদ সদস্যরা করমুক্ত গাড়ি সুবিধা ত্যাগ করে সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়তেও সরকারের সদিচ্ছা লক্ষ্য করা গেছে।
অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা ও মূল্যস্ফীতির চাপ
সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের অর্থনীতি ছিল খাদের কিনারে। উচ্চ ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং বিনিয়োগ সংকট শুরু থেকেই সরকারকে চাপে রেখেছে। গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে অফিস ও শপিং মলের সময়সূচি পরিবর্তন করা হলেও অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এখনো কাটেনি।
আইনশৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্য খাতের সংকট
নির্বাচনী ইশতেহারে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। দেশের বিভিন্ন স্থানে মব জাস্টিস বা গণপিটুনি, চাঁদাবাজি এবং অপহরণের মতো ঘটনা ঘটছে। পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা চললেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে স্বাস্থ্য খাতে বড় বিপর্যয় হয়ে দেখা দিয়েছে ‘হাম’ প্রাদুর্ভাব। দেশজুড়ে এই রোগে ৫০০-র বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে আগে থেকেই টিকা সংকটের ব্যাপারে সতর্ক করা হলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত: সমন্বয়ের অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান সরকারের কাজের সমালোচনা করে বলেন, "প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন চাইলেও মন্ত্রীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রকট। অনেক মন্ত্রী নিজ দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য করছেন, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।"
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ পরিহার করে যোগ্যদের সুযোগ দেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।
সরকারের বক্তব্য: ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকট’
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান সব সংকটের মূলে রয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, "আমরা ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছি। এর সুনির্দিষ্ট ফলাফল দ্রুতই জনগণের সামনে দৃশ্যমান হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।"
উপসংহার
তিন মাসের এই সময়কাল একটি সরকারের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট না হলেও, জনমনে প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে। বিএনপি সরকার এই জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ