ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গর্ব কর্ণেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ

জায়শা জাহান মিমি, স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ
Feb 25, 2026 - 22:55
Feb 25, 2026 - 22:55
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গর্ব কর্ণেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ

২৫শে ফেব্রুয়ারি—বাংলার ইতিহাসে এক রক্তঝরা ও শোকাতুর দিন। ২০০৯ সালের এই দিনে পিলখানার বিডিআর সদরদপ্তরে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমরা হারিয়েছি আমাদের সূর্যসন্তানদের। সেই কালরাত্রিতে শাহাদাতবরণকারী অফিসারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত যার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল দেশপ্রেম আর দায়িত্ববোধের অদম্য সুর।

সেদিন মৃত্যুর মাত্র ৪০ মিনিট আগে শেষবারের মতো হেডকোয়ার্টারে ফোন করেছিলেন তিনি। আর্তনাদ করে বলেছিলেন— “হ্যালো হেডকোয়ার্টার, আমি কর্নেল গুলজার বলছি… কিছু ফোর্স পাঠান প্লিজ। ওরা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে।” তারও কিছুক্ষণ পর সেই অকুতোভয় কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠেছিল এক চরম অসহায়ত্ব— “অনেক অফিসারের লাশ মেঝেতে পড়ে আছে… আপনারা কি আসবেন না আমাদের বাঁচাতে?”

কর্নেল গুলজার ছিলেন এক অদম্য সাহসী এবং চৌকস সেনানি। ২০০৪-০৫ সালে জেএমবি যখন সারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছিল, তখন তার দূরদর্শী নেতৃত্বে ও সুনিপুণ পরিকল্পনায় জঙ্গি নেটওয়ার্কটি গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। সিলেটের ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ থেকে শীর্ষ জঙ্গি শায়েখ আব্দুর রহমানকে বিনা রক্তপাতে আটক করা ছিল তার অসাধারণ গোয়েন্দা কৌশলের এক বড় বিজয়। অথচ তখন নির্দেশ ছিল পুরো বাড়িটি উড়িয়ে দেওয়ার। তার এই পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমেও উচ্চ প্রশংসিত হয়েছিল।

ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে দেশকেই সবসময় বড় করে দেখেছেন এই দেশপ্রেমিক। কুখ্যাত জঙ্গি ‘বাংলা ভাই’কে ধরার অভিযানের সময় তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী যখন তাকে জীবনের ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফিরে আসতে বলেছিলেন, তখন কর্নেল গুলজার দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন— “তোমাদের জন্য আল্লাহ আছেন, আমার জন্যও আছেন। ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে, এখন ফোন রাখো।”

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বিডিআরে যোগদানের মাত্র দশ দিনের মাথায় তাকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ না থাকলেও, হত্যাকাণ্ডের ১১ দিন পর নর্দমা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় চরম বিকৃত অবস্থায়। শেষ পর্যন্ত তার আদরের ছোট সন্তানটিই তার প্রিয় বাবার নিথর দেহ শনাক্ত করে।

৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই প্রিয় জন্মভূমিতে অনেক সেনা অফিসার হয়তো আসবেন, কিন্তু কর্নেল গুলজারের মতো বীরত্বের এক একটি বটবৃক্ষ বারবার জন্মায় না। তার আত্মত্যাগ আর দেশপ্রেমের গল্প বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। আজ সেই বীরের প্রয়াণ দিবসে জাতি তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow