চার বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপা ছোঁয়া হলো না নেইমারের

অনলাইন ডেস্কঃ
৬ জুলাই, ২০২৬ ১১:০১ এএম
শেয়ার করুন:
চার বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপা ছোঁয়া হলো না নেইমারের

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই যেন মাঠের মধ্যেই ভেঙে পড়লেন তিনি [১.২.২, ১.২.৩]। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রা থামতেই চোখের জলে বুক ভাসালেন সেলেসাওদের ‘নম্বর ১০’ নেইমার জুনিয়র [১.১.৫, ১.২.২, ১.২.৭]। সতীর্থরা ছুটে এসে সান্ত্বনা দিলেন, রাফিনিয়া জড়িয়ে ধরলেন বুকে; কিন্তু নেইমারের মলিন মুখের সেই অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়া যেন ছুঁয়ে গেল বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়। 

নেইমারের ক্যারিয়ারে এটি কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নয়, এটি ছিল ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে তাঁর বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বেদনাবিধুর সমাপ্তিও [১.২.২]। ম্যাচ শেষে অশ্রুসজল চোখে নেইমার তাঁর অবসরের ঘোষণা দিয়ে বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি, অনেক চেষ্টা করেছি... এখন সব শেষ।” [১.২.২, ১.২.৩]

চার বিশ্বকাপের ট্রাজিক নায়ক
২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং সবশেষ ২০২৬—চার চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও সোনালী ট্রফিটি ছোঁয়া হলো না এই ফুটবল জাদুকরের। ব্রাজিলের ইতিহাসে পেলে, কাফু, রোনালদো নাজারিওর মতো কিংবদন্তিরা চার বা তার বেশি বিশ্বকাপে খেলেছেন এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেয়েছেন। তবে নেইমার ও থিয়াগো সিলভার মতো দুর্ভাগ্যবান তারকাদের নাম ইতিহাসে হয়তো আলাদাই থেকে যাবে, যাঁরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ মুকুট স্পর্শ করতে পারলেন না।

ম্যাচের চালচিত্র ও হালান্ড-ঝড়
নকআউট পর্বের এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে নেইমারকে শুরু থেকে একাদশে রাখেননি কোচ কার্লো আনচেলত্তি [১.২.৫, ১.২.৯]। দ্বিতীয়ার্ধে যখন তিনি বদলি হিসেবে মাঠে নামেন, তখনও ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়নি [১.১.২, ১.২.৫]। কিন্তু মাঠে নামার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নরওয়ের দিকে চলে যায়। 

৭৯ মিনিটে ব্রাজিল শিবিরের বুকে প্রথম আঘাত হানেন নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড [১.১.২, ১.১.৫]। আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের চমৎকার ক্রস থেকে শক্তিশালী হেডে গোল করেন তিনি [১.১.২, ১.২.৪]। এরপর ৮৯ মিনিটে আবারও হালান্ড-ঝড় [১.১.২, ১.১.৩]। তাঁর দ্বিতীয় গোলের পর ব্রাজিলের ফেরার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় [১.১.২]। 

পেলের রেকর্ডে ভাগ বসালেও সান্ত্বনা মেলেনি
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে (৯০+১০ মিনিটে) পেনাল্টি থেকে সান্ত্বনাসূচক গোল করে ব্যবধান ২-১ করেন নেইমার [১.১.৩, ১.২.৪, ১.২.৮]। এই গোলের মাধ্যমে তিনি কিংবদন্তি পেলের পাশে নিজের নাম লেখান। ব্রাজিলের হয়ে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) গোল করার অনন্য কীর্তি এখন শুধু পেলে ও নেইমারের। কিন্তু এই ব্যক্তিগত অর্জনও দলের বিদায়ের হাহাকারকে আড়াল করতে পারেনি। গোল করেও দলকে জেতাতে না পারার যন্ত্রণাই মাঠজুড়ে তাঁর কান্নায় ফুটে উঠেছিল।

অপূর্ণতার এক অন্তহীন মহাকাব্য
নেইমারের বিশ্বকাপ অভিযানের পুরো ইতিহাসটাই যেন ট্র্যাজেডিতে ঘেরা। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে তিনি ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা, কিন্তু কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে পিঠের চোটে পড়ে সেমিফাইনালের আগেই তাঁর টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যায়। এরপর জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের দুঃস্বপ্ন দেখে ব্রাজিল। 

২০১৮ সালে রাশিয়ায় বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়, এবং ২০২২ সালে কাতারে অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের দুর্দান্ত গোলের পরও পেনাল্টি শুটআউটে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে কান্নাভেজা বিদায়। ২০২৬ সালেও সেই ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ, আবারও নকআউটের দুঃখগাথা।

একটি যুগের অবসান
এবারের বিশ্বকাপে চোট ও ফিটনেস সমস্যার কারণে নেইমারের ভূমিকা ছিল বেশ সীমিত [১.২.৫]। পুরো টুর্নামেন্টে নিজের চিরচেনা ছন্দে ৯০ মিনিট মাঠ মাতানোর অবস্থায় হয়তো তিনি ছিলেন না [১.২.৫]। তবুও হলুদ জার্সির নম্বর ১০ পিঠে চাপিয়ে তিনি বহন করে গেছেন কোটি ভক্তের আবেগ ও প্রত্যাশা। 

নেইমারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের একটি সোনালী প্রজন্মের স্বপ্নযাত্রা শেষ হলো। গোল, রেকর্ড, চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিং আর কান্নার গল্প সবই থাকল; কেবল ফুটবল বিধাতা তাঁর হাতে তুলে দিলেন না কাঙ্ক্ষিত সেই বিশ্বকাপ ট্রফি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।