পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা

অনলাইন ডেস্কঃ
২ জুলাই, ২০২৬ ৩:২৬ পিএম
শেয়ার করুন:
পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা

পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা প্রত্যেক সন্তানের জন্য একটি বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ভরণপোষণ বলতে কী বোঝায়?
‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী, ‘পিতা’ বলতে সন্তানের জন্মদাতা এবং ‘মাতা’ বলতে সন্তানের গর্ভধারিণীকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘ভরণপোষণ’ বলতে বোঝানো হয়েছে পিতা-মাতার উপযুক্ত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং নিয়মিত খোঁজখবর ও তাদের প্রয়োজনীয় সঙ্গ প্রদান করা।

আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিক ও সন্তানের প্রধান দায়িত্বসমূহ:

ভরণপোষণ নিশ্চিতকরণ (ধারা ৩): প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার দৈনন্দিন ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এই দায়িত্ব বণ্টন বা সমন্বয় করে নেবেন।
বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে বাধ্য না করা: পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধনিবাস বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না। সন্তানকে পিতা-মাতার সাথে একই স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
চিকিৎসা ও নিয়মিত খোঁজখবর: সন্তানের জন্য নিয়মিত পিতা-মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষার ব্যবস্থা করা বাধ্যতামূলক।
আলাদা বসবাসের ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা: পিতা-মাতা ও সন্তান যদি কোনো কারণে আলাদা বসবাস করেন, তবে সন্তানের দৈনিক বা মাসিক আয় থেকে একটি যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত পিতা-মাতাকে দিতে হবে।
দাদা-দাদী ও নানা-নানীর দায়িত্ব (ধারা ৪): পিতার অনুপস্থিতিতে দাদা-দাদী এবং মাতার অনুপস্থিতিতে নানা-নানীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নাতি-নাতনিদের ওপর বর্তাবে। এটিও পিতা-মাতার ভরণপোষণের অংশ হিসেবেই গণ্য হবে।

অপরাধের শাস্তি ও আইনি বিধান (ধারা ৫):
সন্তানের শাস্তি: আইনের ৩ বা ৪ ধারার কোনো নিয়ম বা নির্দেশ লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
সহযোগীদের শাস্তি: কোনো সন্তানের স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র-কন্যা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণপোষণে বাধা সৃষ্টি করেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তাকেও অপরাধের সহায়তাকারী হিসেবে বিবেচনা করে একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

আইনের তাৎপর্য ও সামাজিক গুরুত্ব:
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন এ আইনটিকে বাংলাদেশের পারিবারিক মূল্যবোধ ও প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষায় একটি অত্যন্ত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

তাঁর মতে, আইনটি শুধু শাস্তির বার্তা দেয় না, বরং পারিবারিক বন্ধনকে আরও মজবুত করতে ভূমিকা রাখে। আইনটির গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক হলো:
আপোষ-মীমাংসার সুযোগ (ধারা ৮): এই ধারার আওতায় যেকোনো পারিবারিক বিরোধ আদালতের বাইরে স্থানীয়ভাবে আপোষ-মীমাংসার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে, যা আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভরণপোষণ তহবিল ও পরিচর্যাকেন্দ্র: ২০২৩ সালের বিধিমালা অনুযায়ী অসহায় প্রবীণদের জন্য বিশেষ 'ভরণ-পোষণ তহবিল' ও 'পরিচর্যাকেন্দ্র' গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রবীণদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার বার্তা দেয়।

আইনজীবী খালিদ হোসাইন আরও জানান, এই আইনের মূল লক্ষ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয়, বরং সন্তানদের তাদের পবিত্র দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়া। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে প্রবীণরা সমাজে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা পাবেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।