ভারতের পানি আগ্রাসন ও পদ্মা ব্যারাজ

অনলাইন ডেস্কঃ
১৯ মে, ২০২৬ ১১:৫৯ এএম
শেয়ার করুন:
ভারতের পানি আগ্রাসন ও পদ্মা ব্যারাজ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনীতে পদ্মা ছিল একটি স্বতন্ত্র সত্তা—প্রাণবন্ত, প্রবহমান ও রূপময়ী। অথচ আজ সেই পদ্মা তার যৌবন হারিয়ে কেবলই ধু-ধু বালুচর। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট এই কৃত্রিম জলসংকট বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, প্রকৃতি ও জীবনযাত্রায় ডেকে এনেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। দীর্ঘদিনের এই পানি আগ্রাসনের বিপরীতে বাংলাদেশ এখন আশার আলো হিসেবে দেখছে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পকে।

ফারাক্কা: একটি নদী হত্যার আখ্যান
ভারত কর্তৃক নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করায় শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার প্রবাহ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বাঁধটির মূল লক্ষ্য ছিল ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে পানি সরিয়ে কলকাতা বন্দরকে পলিামুক্ত রাখা। ১৯৭৫ সালে চালু হওয়া এই বাঁধটি বাংলাদেশের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে পদ্মা তার শাখা নদীগুলোর সংযোগ হারিয়ে আজ মৃতপ্রায়।

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বঞ্চনার ইতিহাস
বিভিন্ন সময় গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি হলেও বাস্তবে বাংলাদেশ কখনোই তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি। ১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক চুক্তি থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই চুক্তিমাখিত পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বারবার হোঁচট খেয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও অভিন্ন নদীর দাবি উপেক্ষা করে ভারতের এই পানি আগ্রাসন অব্যাহত থাকায় দেশের কোটি মানুষ আজ অবর্ণনীয় দুর্দশার সম্মুখীন।

পদ্মা ব্যারাজ: বাংলাদেশের নতুন আশাবাদ
বর্তমান সরকার দেশের নদী অববাহিকা রক্ষা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংকট নিরসনে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি কোনো নতুন ভাবনা নয়, বরং পাকিস্তান আমল থেকেই ভারতের পানি আগ্রাসনের পাল্টা কৌশল হিসেবে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ৫ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং প্রথম ধাপে বিপুল অংকের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ব্যারাজের প্রভাব ও সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিতব্য এই ব্যারাজটি কার্যকর হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিত্র বদলে যাবে। এর মূল সুবিধাগুলো হলো:
পানি সংরক্ষণ: প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
নদী পুনরুজ্জীবন: হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীসহ পাঁচটি প্রধান নদ-নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
কৃষি বিপ্লব: বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন: ব্যারাজ এলাকায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

আগামীর পথচলা
পানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ক্রমবর্ধমান পানির সংকট এবং সুন্দরবন এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি ঠেকাতে এই ব্যারাজ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির দৃঢ় ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন নেই, কারণ এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনার অংশ।

ভারতের বিরোধিতার সম্ভাবনা থাকলেও, জনস্বার্থে এবং দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় এই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। কোটি মানুষের প্রত্যাশা—পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আবারও প্রবহমান হয়ে উঠবে আমাদের নদীগুলো, ফিরবে নদমাতৃক বাংলাদেশের হারানো গৌরব।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।