কুবিতে ছাত্রদল-বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হুমকির অভিযোগ

আলী আকবর শুভ, কুবি প্রতিনিধি, কুমিল্লাঃ
Mar 31, 2026 - 09:16
Mar 31, 2026 - 09:16
কুবিতে ছাত্রদল-বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হুমকির অভিযোগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সকল ধরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সিন্ডিকেট সভা বন্ধ রাখতে প্রশাসনকে হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এছাড়াও বিএনপিপন্থী কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শর্তসাপেক্ষে সিন্ডিকেট সভা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সোমবার (৩০ মার্চ) দুপুরে উপাচার্যসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মর্কর্তাদের দপ্তরে এ ঘটনা ঘটে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ এবং যুগ্ম-আহ্বায়ক আবুল বাশারসহ আরও দুইজন প্রক্টরের দপ্তরে প্রবেশ করে তাকে সকল দাপ্তরিক কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে রেজিস্ট্রারের দপ্তরে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নাম উল্লেখ করে সকল ধরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা বন্ধ রাখার হুমকি স্বরুপ নির্দেশ দেন তারা। এছাড়াও উপাচার্যের দপ্তরে গিয়ে সকল প্রকার আপগ্রেডেশন বোর্ড বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে ছাত্রদলের এসব বিষয় নিয়ে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সাথে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসময় ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করীম, শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক ও মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার এবং একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন উপাচার্যের দপ্তরে উপস্থিত হয়ে পদোন্নতি বোর্ড না করার জন্য এবং যদি সিন্ডিকেট সভা হয় তাহলে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মে অভিযুক্ত হয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা সাবেক রেজিস্ট্রার মুজিবুর রহমান এবং জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার নেতৃত্ব দেওয়া, শিক্ষকদের হুমকি দেওয়াসহ নানাবিধ অভিযোগের কারণে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তার জাকিরের ফাইল না উঠানোর নির্দেশ দেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসের ৭ তারিখে ১০৯ তম সিন্ডিকেট সভা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ছাত্রদলের বাঁধার কারণে তা পিঁছিয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তখনও ছাত্রদল এবং বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের বাঁধা দেওয়ায় তা পুনরায় পিছিয়ে ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা বাঁধা দিলে তৃতীয় দফায় সভা পিছিয়ে এপ্রিলের ১৫ নিয়ে যাওয়া হয়।

এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম বলেন‚ ‘আজ দুপুরে ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান শুভসহ আরও কয়েকজন আমার অফিসে এসে আমাকে হুমকি দিয়েছে। তারা বলেছে আমি যেন সবধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখি।'

তবে এবিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামালের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। রেজিস্ট্রার থেকে বিস্তারিত জানার জন্য প্রতিবেদককে পরামর্শ দেন তিনি।

এ বিষয়ে সিন্ডিকেটের সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, 'ছাত্রদলের কয়েকজন এসে শিক্ষামন্ত্রনালয়ের দোহাই দিয়ে আমাকে হুমকি দিয়ে গেছে, যাতে সিন্ডিকেট সভার আয়োজন না করি। পূর্বেও তিনবার তারিখ পিছানো হয়েছে। আগামী মাসের ১৫ তারিখে আমাদের সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করা হয়েছে। সেটা বন্ধ রাখার জন্য তারা হুমকি দিয়ে গেছে।

শিক্ষামন্ত্রনালয় থেকে কোনো নোটিশ পাঠিয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'শিক্ষামন্ত্রনালয় থেকে আমাদেরকে অফিসিয়াল কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি।'

কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কথায় আপনারা সিন্ডিকেট সভা বন্ধ রাখবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন‚ 'আমরা চাই-না ক্যাম্পাসে কোনো ক্যাওয়াস (হট্টগোল) তৈরী হোক। তাছাড়া সিন্ডিকেট সভায় অতিথি শিক্ষকও থাকেন, তাদের সাথে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুন্ন করতে পারে। এমনিতেই শিক্ষার্থীরা একাডেমিক্যালি পিছিয়ে আছে। যদি তারা কোনো ক্যাওয়াস সৃষ্টি করে আবারও শিক্ষার্থীদেরকে সেশনজটে ফেলে দেয়‚ সেই শংকা থেকেই আমরা বন্ধ রাখতে চাচ্ছি।'

উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী বলেন, ছাত্রদলের ৪-৫ জন ছেলে আমার কাছে এসেছে। এসময় তারা সিন্ডিকেট সভা ও সকল প্রকার আপগ্রেডেশন বোর্ড বন্ধ রাখার কথা বলে। তারা বলে, 'আপনাকে আগেও বলেছি সিন্ডিকেট সভা না দিতে। তারপরেও আপনি দিচ্ছেন। আপনাকে সকল আপগ্রেডেশন বন্ধ রাখতে বলেছি। আমরা বলেছি বোর্ড হবে না, মানে হবে না।' তখন আমি বললাম তাহলে তো ছাত্ররা পিছিয়ে যাবে। পরে তারা বললো পিছিয়ে গেলে কোনো সমস্যা নাই।

তিনি আরো বলেন, 'পরে বিএনপিপন্থী তিনজন শিক্ষক এসেও বলেছেন পদোন্নতি বোর্ড না করার জন্য এবং যদি সিন্ডিকেট সভা হয় তাহলে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মে অভিযুক্ত হয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা সাবেক রেজিস্ট্রার এবং জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার নেতৃত্ব দেওয়া ও নানাবিধ অভিযোগের কারণে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এক কর্মকর্তার ফাইল উঠানো যাবে না।'

অভিযোগের বিষয়ে কুবি শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মুস্তাফিজুর রহমান শুভর কাছে জানতে চাওয়া হলে বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, 'আমি এসব কিছু বলি নাই। আমাদের কেউ এসবের সাথে জড়িত না। আপনাদের এসব কে বলেছে তা বলেন'।

কুবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন‚ এ বিষয়ে আমি জানি না। আমি ক্যাম্পাসে নেই৷ যারা গেছে তাদের সাথে কথা বলে তারপর বলতে পারবো।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এর আগে বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই কুবি ছাত্রদলের একাংশের নেতারা প্রশাসনকে কয়েক দফায় পদত্যাগ করার চাপ দেয় এবং সকল ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেয়।

এই বিষয়ে কুবির ছাত্রদল নেতাদের সাথে কথা বললে তারা জানান, সরকার গঠনের পর ছাত্রদলের অনেকেই পদ ব্যবহার করে বিভিন্ন চাঁদাবাজি করার অভিযোগ পাচ্ছি। সিনিয়রদের বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। তাই কেউ কিছু বলছে না। সরকার গঠনের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য প্রশাসনকে কয়েক দফা হুমকি দিচ্ছে। যেটা ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ছাত্রদলের ইমেজ নষ্ট করতেছে। তবে প্রশাসন যদি অনৈতিকভাবে কোন কিছু করে, আমরাও এটার বিরুদ্ধে অবস্থান নিবো।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow