টিকি-টাকার গোলকধাঁধায় ফের পথহারা স্পেন: বল দখলে হিরো, গোল করায় ‘বিগ জিরো’

অনলাইন ডেস্কঃ
১৭ জুন, ২০২৬ ১:৩৩ পিএম
শেয়ার করুন:
টিকি-টাকার গোলকধাঁধায় ফের পথহারা স্পেন: বল দখলে হিরো, গোল করায় ‘বিগ জিরো’

পুরো ম্যাচে ৭৪ শতাংশ বলের দখল, ৭৬৪টি সফল পাস এবং প্রতিপক্ষের গোলমুখে আটটি শট—পরিসংখ্যানের এই চোখধাঁধানো রূপ দেখে যে কেউ ভাববেন ম্যাচটি অনায়াসেই জিতে নিয়েছে স্পেন। কিন্তু ফুটবলের নির্মম বাস্তবতা হলো, গোল না করতে পারলে সব পরিসংখ্যানই মূল্যহীন। ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই পুঁচকে কেপ ভার্দের জমাট ডিফেন্স ভাঙতে না পেরে গোলশূন্য (০-০) ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যদের। আর এই ড্রয়ের মধ্য দিয়ে স্প্যানিশ ফুটবল আরও একবার মুখোমুখি হলো তাদের চিরচেনা সেই ‘টিকি-টাকা’র অভিশাপের।

পাসিংয়ের মহোৎসব, লক্ষ্যহীন আক্রমণ
ফুটবল শুধু বল নিজের পায়ে রাখার খেলা নয়, বরং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে জায়গা বের করারও খেলা। ঠিক এই জায়গাতেই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে স্পেন। পুরো ম্যাচজুড়ে স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের মধ্যে পাসের পর পাস খেলার প্রবণতা দেখা গেলেও তাতে ছিল না কোনো কার্যকারিতা। সেন্টার-ব্যাক থেকে মিডফিল্ড, কিংবা উইঙ্গার থেকে ফুল-ব্যাক—বল কেবল আনুভূমিকভাবে ঘুরেছে, কিন্তু প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চিরে ফেলার মতো কোনো ‘ভার্টিক্যাল পাস’ বা গতিশীল আক্রমণ চোখে পড়েনি। অতিরিক্ত বল দখলের এই চোর-পুলিশ খেলায় শেষ পর্যন্ত গোলমুখের দেখা পায়নি সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

ওয়ারজাবালের অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড
স্পেনের আক্রমণভাগের দৈন্যদশা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে স্ট্রাইকার মিকেল ওয়ারজাবালের পারফরম্যান্সে। ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে তিনি একবারের জন্যও বল স্পর্শ করতে পারেননি! ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে কোনো স্ট্রাইকারের ক্ষেত্রে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আর ঘটেনি। এটি কেবল ওয়ারজাবালের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং স্পেনের পুরো মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মধ্যকার দূরত্বের এক চরম প্রতিচ্ছবি। দল এত বল দখলে রেখেও তাদের মূল স্ট্রাইকারকে কার্যকর কোনো পাসই সরবরাহ করতে পারেনি।

টিকি-টাকার সেই পুরোনো ব্যাধি
এই সমস্যা স্পেনের জন্য নতুন কিছু নয়। অতীতেও এই বল দখলের অতিরিক্ত মোহ তাদের ভুগিয়েছে:
২০১৪ বিশ্বকাপ: নেদারল্যান্ডস ও চিলির বিপক্ষে বল দখলে এগিয়ে থেকেও গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়।
২০১৮ বিশ্বকাপ: রাশিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে এক হাজারের বেশি পাস খেলে টাইব্রেকারে বিদায়।
২০২২ বিশ্বকাপ: মরক্কোর বিপক্ষে ৭৭ শতাংশ বলের দখল রেখেও গোল করতে না পেরে টাইব্রেকারে বিদায়।

২০২৬ আসরের প্রথম ম্যাচেই সেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটল। একসময়ের ত্রাস সৃষ্টি করা ‘টিকি-টাকা’ কৌশলটিই এখন স্পেনের জন্য বড় এক সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেপ ভার্দের প্রতিরোধ ও ‘ভোজিনহা’ প্রাচীর
কেপ ভার্দে ভালো করেই জানত স্পেনের খেলার ধরন সম্পর্কে। তাই তারা শুরু থেকেই নিজেদের ডি-বক্সের সামনে গভীর রক্ষণভাগ বা ‘লো-ব্লক’ তৈরি করে অপেক্ষা করেছে। স্পেনকে নিজেদের অর্ধ্বে পাস খেলার সুযোগ দিলেও ডি-বক্সের ভেতর এক ইঞ্চি জায়গাও দেয়নি তারা। স্পেনের নেওয়া শটগুলো বারবার প্রতিহত হয়েছে কেপ ভার্দের রক্ষণদেয়ালে। আর যে কয়েকটি শট অন-টার্গেট ছিল, তা অতন্দ্র প্রহরীর মতো রুখে দিয়েছেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলকিপার ভোজিনহা। গোলশূন্য ড্রয়ের এই ম্যাচে কেপ ভার্দের আসল নায়ক তিনিই।

‘ছোট দল বলে কিছু নেই’—কোচ দে লা ফুয়েন্তে
ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে নিজের হতাশা লুকানোর চেষ্টা করেননি। তিনি বলেন, 
> “আমাদের এই ম্যাচটি জেতা উচিত ছিল। আমরা সুযোগ তৈরি করলেও শেষ মুহূর্তের ফিনিশিংয়ে নিখুঁত ছিলাম না। তবে কেপ ভার্দে শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাদের রক্ষণভাগ ভাঙা কঠিন ছিল। আধুনিক ফুটবলে আসলে ছোট দল বলে এখন আর কিছু নেই।”

স্পেনের জন্য সতর্কবার্তা
গ্রুপ পর্বে নকআউট পর্বের টিকিট পেতে হলে স্পেনের সামনে এখন সৌদি আরব ও উরুগুয়ের মতো কঠিন প্রতিপক্ষ। শুধু বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিলেই চলবে না, প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে আক্রমণের ধার বাড়াতে হবে। আধুনিক ফুটবলের গতি ও দিক পরিবর্তনের সাথে স্পেন যদি দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারে, তবে তাদের এই বিশ্বকাপ মিশনও সময়ের আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে। স্প্যানিশ সমর্থকরা নিশ্চয়ই তা চাইবেন না।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।