যমজ সন্তান কোলে মা–বাবা, একটি মৃত, অন্যটিও হামে আক্রান্ত

অনলাইন ডেস্কঃ
May 14, 2026 - 13:21
যমজ সন্তান কোলে মা–বাবা, একটি মৃত, অন্যটিও হামে আক্রান্ত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বাবা কামরুজ্জামানের কোলে সাদা কাপড়ে মোড়ানো পাঁচ মাস বয়সী রাইসার নিথর দেহ। পাশে মা জান্নাতি বেগমের কোলে রাইসার যমজ বোন রুমাইসা, যে নিজেও এখন হামের সঙ্গে লড়াই করছে। রাইসাকে বাঁচানো যায়নি, কিন্তু রুমাইসাকে নিয়ে অনিশ্চিত গন্তব্যে ফিরতে হচ্ছে এই শোকাতুর মা-বাবাকে।

অভাব ও অবহেলার বলি রাইসা
ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ৯ দিন ধরে যমজ সন্তানদের নিয়ে ছোটাছুটি করেছেন এই দম্পতি। রাইসার অবস্থা অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউ (PICU) সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিন দিন আগেই। কিন্তু সামর্থ্য ছিল না এই গরিব বাবা-মায়ের। ধারদেনা করে যখন রাইসাকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হলো, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভর্তির কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায় শিশুটি। মা জান্নাতি বেগমের আক্ষেপ, "টাকার অভাবে সময়মতো আসতে পারলাম না, যখন আসলাম ততক্ষণে মেয়েটাই চলে গেল।"

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রকোপ
রাইসা একা নয়, দেশে হামের সংক্রমণ এখন মহামারির রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮টি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই রোগ। এ নিয়ে দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩২ জনে। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০ হাজার। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ধীরগতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণেই এবারের সংক্রমণ এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

চিকিৎসা সংকটে দিশেহারা অভিভাবক
হামের এই জটিল পরিস্থিতিতে জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা পিআইসিইউর চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, মাত্র ১৭টি পিআইসিইউ শয্যা নিয়ে এই বিশাল রোগীর চাপ সামলানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুমূর্ষু শিশুদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে অথবা অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। আর এই অপেক্ষার মাঝেই ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ।

চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা
সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ বহন করতে হয় ব্যক্তিকে নিজে। রাইসা ও রুমাইসার মতো সাধারণ পরিবারের জন্য এই খরচ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। জন্মের সময় ১৫ দিন আইসিইউতে থাকার বিপুল খরচ মেটানোর পর, পুনরায় হামের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন কামরুজ্জামান। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার পাঁচ হাজার টাকা জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

যমজ শিশুদের বাড়তি ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, যমজ শিশুদের ক্ষেত্রে একজনের হাম হলে অন্যজনের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় শতভাগ। এদের সেবা ও যত্ন নেওয়া একজন মায়ের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে জটিলতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। রাইসা ও রুমাইসার মতো আরও অনেক যমজ শিশু বর্তমানে এই মরণব্যাধির সঙ্গে লড়াই করছে।

ঢাকা মেডিকেলের সামনে অ্যাম্বুলেন্সটি যখন ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল, তখন মা জান্নাতি বেগম বারবার নিথর রাইসার মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে দেখছিলেন। এক সন্তানকে হারানোর শোক আর অন্য সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার আকুতি নিয়ে তারা যখন বাড়ির পথে রওনা হলেন, তখন চারপাশের বাতাস যেন এক নীরব হাহাকারে ভারী হয়ে উঠেছিল।

দেশের বর্তমান এই স্বাস্থ্য সংকট কাটাতে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং জেলা পর্যায়ে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র স্থাপন এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় আরও অনেক ‘রাইসা’কে আমাদের অকালেই হারাতে হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow