বাজেটে মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর করের বোঝা: কতটুকু যৌক্তিক এই সিদ্ধান্ত?

অনলাইন ডেস্কঃ
May 14, 2026 - 13:03
বাজেটে মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর করের বোঝা: কতটুকু যৌক্তিক এই সিদ্ধান্ত?

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মোটরসাইকেল মালিকদের জন্য দুঃসংবাদ আসতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চিন্তা করছে সব মোটরসাইকেল মালিককে আয়করের আওতায় আনার। প্রস্তাবিত এই নিয়মে মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর ‘অগ্রিম আয়কর’ (AIT) আরোপ করা হতে পারে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রস্তাবিত করের হার কেমন হতে পারে?
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের সূত্র অনুযায়ী, ইঞ্জিনের ক্ষমতা বা সিসির ওপর ভিত্তি করে বার্ষিক করের পরিমাণ নির্ধারণ করা হতে পারে:
১১১-১২৫ সিসি: বছরে ২,০০০ টাকা।
১২৬-১৬৫ সিসি: বছরে ৫,০০০ টাকা।
১৬৫ সিসির বেশি: বছরে ১০,০০০ টাকা।

তবে ১১০ সিসি পর্যন্ত কম ক্ষমতার মোটরবাইকগুলোকে আপাতত এই করের আওতামুক্ত রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক?
বর্তমানে ব্যক্তিগত গাড়ি বা জিপের ক্ষেত্রে অগ্রিম কর দিতে হলেও মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে তা ছিল না। এনবিআরের যুক্তি হলো—যাঁদের বাইক কেনার সামর্থ্য আছে, তাঁদের কর দেওয়ারও সামর্থ্য আছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। 

১. নিম্ন আয়ের চালক: পাঠাও বা উবারের মতো রাইড শেয়ারিং করে যাঁরা সংসার চালান, কিংবা ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের বিশাল অংশেরই বার্ষিক আয় করযোগ্য সীমার (সাড়ে ৩ লাখ টাকা) নিচে। 
২. শিক্ষার্থী ও সাধারণ ব্যবহারকারী: টিউশনির টাকা জমিয়ে কেনা বাইক বা পরিবারের যাতায়াতের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যানের ওপর এই বাড়তি কর সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলবে। 
৩. চূড়ান্ত কর দায়: গাড়ির ক্ষেত্রে যেমন অগ্রিম কর ফেরত পাওয়া যায় না, মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম হতে পারে। অর্থাৎ, করযোগ্য আয় না থাকলেও এই টাকা সরকারকে দিয়ে দিতে হবে, যা অনেকটা ‘জোর করে টাকা নেওয়া’র শামিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

শিল্প খাতে অশনিসংকেত 

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল খাতের বিনিয়োগ এখন হুমকির মুখে। গত কয়েক বছরে দেশে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ১০টির মতো কারখানা গড়ে উঠেছে। কিন্তু বিক্রির চিত্র হতাশাজনক। ২০২২ সালে যেখানে ৬ লাখ বাইক বিক্রি হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৬৪ হাজারে। 

বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএএমএ) সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, "সরকারের উৎসাহে আমরা কারখানা করলাম, এখন বারবার অযৌক্তিক নীতি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত শিল্পের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।"

এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস মনে করেন, "গণপরিবহনের সংকটে মানুষ মোটরসাইকেলকে জীবনরেখা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এখানে কর বসালে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।"

বিশেষজ্ঞদের মত
সাবেক কর কর্মকর্তারা মনে করছেন, রাজস্ব আদায়ের সহজ পথ হিসেবে এনবিআর এই ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ এবং উচ্চবিত্ত—সবার ওপর একই হারে কর চাপানো ঠিক হবে না। যাঁদের সত্যিকারের করযোগ্য আয় নেই, তাঁদের ওপর এই বোঝা চাপানো কতটা ন্যায়সংগত, তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠকের পরই বোঝা যাবে, শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেল মালিকদের ভাগ্যে করের এই ‘খড়্গ’ নেমে আসে কি না।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow