লাশ চুরিতে কোটি টাকার বাণিজ্য

অনলাইন ডেস্কঃ
May 17, 2026 - 10:28
লাশ চুরিতে কোটি টাকার বাণিজ্য

অন্ধকার রাত। রাজধানীর উপকণ্ঠে কোনো এক নির্জন গোরস্তানে সবেমাত্র দাফন করা হয়েছে এক ব্যক্তিকে। স্বজনরা চোখের জলে বিদায় নিয়ে ফেরার কিছুক্ষণ পরেই সেখানে হানা দেয় একদল ‘লাশচোর’। শাবলের আঘাতে মাটি সরিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয় কাফনের কাপড়, বের করে আনা হয় নিথর দেহটি। এরপর শুরু হয় এক বীভৎস কর্মযজ্ঞ। রাসায়নিক ও অ্যাসিড দিয়ে মাংস গলিয়ে হাড়গুলো আলাদা করা হয়। কয়েক হাত বদল হওয়ার পর সেই হাড়গুলোই ধবধবে সাদা কঙ্কাল হয়ে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে পৌঁছায়। একেকটি কঙ্কাল বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায়।

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও থ্রিডি সিমুলেশনের মাধ্যমে মানবদেহের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করছে, তখন বাংলাদেশের হাজার হাজার হবু চিকিৎসকের পড়াশোনার হাতেখড়ি হচ্ছে কবর থেকে চুরি হওয়া লাশের হাড় দিয়ে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুগের পর যুগ ধরে চলা এই অমানবিক ‘কঙ্কাল বাণিজ্য’ এখন কয়েক কোটি টাকার এক সুসংগঠিত মাফিয়া সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে।

ছাত্রনেতাদের নিয়ন্ত্রণে ‘কঙ্কাল সাম্রাজ্য’
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এই বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজনৈতিক প্রভাবশালী বিশেষ করে ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (মিটফোর্ড) সাবেক এক শিক্ষার্থীর ভাষ্যমতে, তৎকালীন প্রভাবশালী ছাত্রনেতারা এই ব্যবসাকে কোটি টাকা আয়ের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। এই সিন্ডিকেটের কাজ ছিল তিন স্তরে বিভক্ত—একদল কবর থেকে লাশ সরাতো, অন্য দল হাড় আলাদা করতো, আর ছাত্রনেতারা তা ‘ডিস্ট্রিবিউটর’ হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতো।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রভাবশালীরা আত্মগোপনে গেলেও এই অমানবিক প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং এখন অনলাইন গ্রুপ এবং বিভিন্ন গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় একটি ডেন্টাল কলেজের হোস্টেল থেকে বিপুল পরিমাণ মাথার খুলি ও হাড় উদ্ধার হওয়া তারই প্রমাণ দেয়।

বিশ্ব যখন থ্রিডিতে, বাংলাদেশ তখন কবরে
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন আর ‘আসল হাড়’ নির্ভর শিক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। উন্নত দেশগুলো ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও ৯৯% নির্ভুল প্লাস্টিক কঙ্কাল মডেল ব্যবহার করে অ্যানাটমি শিক্ষা দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে এখনো ‘আসল হাড় স্পর্শ না করলে শিক্ষা পূর্ণ হয় না’—এমন এক প্রাচীন ধারণাকে আঁকড়ে ধরে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষক আইটেম পরীক্ষায় আসল হাড় সামনে রেখে ডেমোনস্ট্রেশন দিতে বাধ্য করেন, যা পরোক্ষভাবে এই অবৈধ বাজারকে টিকিয়ে রাখছে।

যেখানে একটি আধুনিক থ্রিডি অ্যাপের বার্ষিক খরচ মাত্র ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা, সেখানে একজন শিক্ষার্থীকে একটি চুরিকৃত কঙ্কালের জন্য গুনতে হচ্ছে ৩০-৪০ হাজার টাকা। পড়াশোনা শেষে এই হাড়গুলোর যথাযথ সৎকার না হয়ে অনেক সময় নর্দমা বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, যা মৃতদেহের প্রতি চরম অবমাননা।

সমাধানের পথ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, লাশ পাহারা দিয়ে এই চুরি ঠেকানো সম্ভব নয়; সমাধান রয়েছে নীতিগত সিদ্ধান্তে। চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শেখ মোহাম্মদ ইরফান বলেন, “প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য এত কঙ্কাল বৈধ পথে সংগ্রহ করা অসম্ভব। প্রতিটি মেডিকেল কলেজ যদি নিজস্ব ‘বোনস ব্যাংক’ গড়ে তোলে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্লাস্টিক মডেল বা ডিজিটাল সিমুলেশন বাধ্যতামূলক করা হয়, তবেই এই সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা সম্ভব।”

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিএমডিসি (BMDC) যদি মেডিকেল পরীক্ষায় ‘আসল হাড়’ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘোষণা দেয়, তবেই বন্ধ হবে লাশের অবমাননা এবং ধ্বংস হবে এই অন্ধকার কঙ্কাল বাণিজ্য।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow