ঢাকা ট্রেড সেন্টারে দুর্নীতির মহোৎসব: নকশা বহির্ভূত ‘ছাদ বাণিজ্য’ ও অবৈধ দোকানের ভিড়

অনলাইন ডেস্কঃ
May 17, 2026 - 10:36
ঢাকা ট্রেড সেন্টারে দুর্নীতির মহোৎসব: নকশা বহির্ভূত ‘ছাদ বাণিজ্য’ ও অবৈধ দোকানের ভিড়

রাজধানীর গুলিস্তানে অবস্থিত অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘ঢাকা ট্রেড সেন্টার’ (উত্তর ও দক্ষিণ) এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। মার্কেটের অনুমোদিত নকশা ও সিটি করপোরেশনের নীতিমালা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ছাদজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ১৭০টিরও বেশি অবৈধ দোকান ও গুদামঘর। প্রভাবশালী নেতাদের এই ‘ছাদ বাণিজ্য’ এবং অভ্যন্তরীণ অনিয়মের কারণে একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ ব্যবসায়ীরা হারাচ্ছেন সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ।

নকশা বহির্ভূত নির্মাণ ও কোটি টাকার বাণিজ্য
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মার্কেটের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের ছাদে টিনের শেড দিয়ে অস্থায়ীভাবে ১৭০টিরও বেশি দোকান ও গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘর ভাড়া ও জামানতের নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিশাল অঙ্কের টাকা। প্রতিটি ঘর ভাড়া নিতে ব্যবসায়ীদের গুণতে হচ্ছে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত, আর মাসিক ভাড়া বাবদ দিতে হচ্ছে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের নেপথ্যে রয়েছেন ঢাকা ট্রেড সেন্টার উত্তর ও দক্ষিণ মার্কেট মালিক সমিতির প্রভাবশালী শীর্ষ নেতারা।

নিরাপত্তাকর্মীদের আড়ালে লুকোচুরি
এসব অবৈধ নির্মাণের বিষয়ে মার্কেট সমিতির নেতারা দাবি করছেন, নিরাপত্তাকর্মীদের আবাসন সুবিধার কথা চিন্তা করে কিছু ঘর তৈরি করা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নিরাপত্তাকর্মীদের দাবি অনুযায়ী, ১৭০টি ঘরের মধ্যে তাদের জন্য বরাদ্দ মাত্র দুটি কক্ষ। বাকি প্রায় সব ঘরই ব্যবসায়ীদের কাছে গুদাম বা দোকান হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যেখানে জুতা, পোশাক ও কম্বলসহ বিভিন্ন মালামাল মজুত রাখা হচ্ছে।

অতিরিক্ত ৭০০ দোকান ও রাজস্ব ফাঁকি
কাগজে-কলমে সিটি করপোরেশনের বরাদ্দকৃত দোকানের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার হলেও বর্তমানে মার্কেটে দোকানের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ অনুমোদিত নকশার বাইরে আরও প্রায় ৭০০ অতিরিক্ত দোকান পরিচালনা করছে মার্কেট কমিটি। এসব অতিরিক্ত দোকানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে সিটি করপোরেশনকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছেন প্রভাবশালী নেতারা। সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শনে এলেও এসব অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)
মার্কেটের অনিয়ম ও সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়ে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের সহকারী পরিচালক আরিফ আহম্মদ জানিয়েছেন, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি নিয়ে নিবিড় অনুসন্ধান চলছে।

দায়িত্বশীলদের বক্তব্য
উত্তর মার্কেট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাসেত মাস্টার একে ‘নিরাপত্তাকর্মীদের সুবিধার্থে নির্মিত ঘর’ বলে দাবি করলেও দক্ষিণ অংশের সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন রানা এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, সাধারণ ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এই একক আধিপত্য ও দুর্নীতির কারণে মার্কেটের পরিবেশ দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদাসীনতা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে রাজধানীর এই ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি এখন খাদের কিনারায়। ব্যবসায়ীরা দ্রুত এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow