স্কুল ফিডিং প্রকল্পে ‘সাগর চুরি’, সপ্তাহে কলা-ডিমেই লোপাট ১৭ কোটি টাকা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা 'স্কুল ফিডিং' প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সপ্তাহে কেবল কলা, ডিম ও বানরুটি খাতেই প্রায় ১৭ কোটি টাকা লোপাট করছে একটি অসাধু চক্র। নিম্নমানের, পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেয়ে দেশজুড়ে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে কোমলমতি শিশুরা। ইতোমধ্যে এই খাবার খেয়ে অন্তত তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি যমুনা টেলিভিশনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই 'সাগর চুরি'র চিত্র।
প্রকল্পের রূপরেখা ও দুর্নীতির চিত্র
গত বছরের (২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর) থেকে দেশের প্রায় ১৫০টি উপজেলায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে স্কুল ফিডিং প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট দেওয়ার কথা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, খাবারের মান ও ওজনে ব্যাপক জালিয়াতি করা হচ্ছে:
ফাঙ্গাসযুক্ত বানরুটি: প্রতিটি ১২০ গ্রাম ওজনের রুটির সরকারি বাজেট ২৪ টাকা। কিন্তু শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে দুর্গন্ধযুক্ত ও ফাঙ্গাস পড়া রুটি। এমনকি জালিয়াতি করে ওজন ঠিক রাখতে রুটি ভিজিয়ে সরবরাহ করার প্রমাণও মিলেছে।
পচা ও ওজনে কম ডিম: নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ডিমের ওজন ন্যূনতম ৬০ গ্রাম হওয়ার কথা, যার বাজেট ১৪ টাকা। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে ৩৫-৪০ গ্রামের ছোট ডিম। ছোট ডিম দেওয়ায় প্রতিটি ডিমে অন্তত ১ টাকা করে পকেটে ভরছে অসাধু চক্র। পাশাপাশি পচা ও ঠিকমতো সেদ্ধ না করা ডিম দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
অখাদ্য কলা: প্রতিটি ১০০ গ্রাম ওজনের কলার দাম সাড়ে ১০ টাকা ধরা হলেও, দেওয়া হচ্ছে কাঁচা, শক্ত ও ওজনে কম কলা। অথচ স্থানীয় বাজারে এসব কলার প্রকৃত দাম মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা। কলার বাজেট থেকেই সপ্তাহে প্রায় দুই কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা, আতঙ্কিত অভিভাবকরা
অস্বাস্থ্যকর এসব খাবার খেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩০০ শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শঙ্করবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একসঙ্গে ২০ জন শিক্ষার্থী বমি ও পেট ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়। রাইসা মুনতাহা নামে এক শিক্ষার্থীকে দুদিন হাসপাতালেও ভর্তি থাকতে হয়। সন্তানদের এমন অবস্থায় চরম শঙ্কায় পড়েছেন অভিভাবকরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সতর্ক করে জানিয়েছেন, এসব ক্ষতিকর ও বাসি খাবার শিশুদের লিভারের ক্ষতিসহ ডায়রিয়া, জন্ডিস এবং হেপাটাইটিসের মতো মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
প্রকল্পের এমন বেহাল দশায় নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, কোমলমতি শিশুদের খাবারের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং অভিযুক্ত ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানান, খাবারের মান নিশ্চিতে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি সরাসরি খাবারের মান যাচাই করে তা গ্রহণ করবেন।
উল্লেখ্য, আগামীতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে চলমান প্রকল্পের এমন দুর্নীতির পর এর স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ