হামের সংক্রমণের মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডিপথেরিয়া। ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

অনলাইন ডেস্কঃ
May 13, 2026 - 12:03
হামের সংক্রমণের মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডিপথেরিয়া। ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

দেশে যখন হামের সংক্রমণ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তখনই নতুন আপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ ‘ডিপথেরিয়া’। এক সময় দেশ থেকে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এই রোগটি আবারও বিভিন্ন জেলায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সঠিক সময়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

সংক্রমণের বর্তমান চিত্র
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এবং রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিপথেরিয়ার রোগী শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (আইডিএইচ) ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও আক্রান্ত শিশুরা চিকিৎসা নিচ্ছে। এরই মধ্যে এই রোগে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা এবং শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াই এই রোগ ফিরে আসার প্রধান কারণ। বিশেষ করে চলমান হাম সংক্রমণের ফলে শিশুদের শরীর ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা ডিপথেরিয়ার মতো রোগকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

উৎস ও অতীত সতর্কতা
বাংলাদেশে ডিপথেরিয়ার বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব প্রথম দেখা যায় ২০১৭ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সে সময় ১৫ জন মারা যায় এবং প্রায় আট শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়। তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছিল যে, এই সংক্রমণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সেই সতর্কবার্তার পর দীর্ঘমেয়াদী কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে এই রোগী পাওয়া যাচ্ছে।

ডিপথেরিয়া আসলে কী?
ডিপথেরিয়া একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ, যা মূলত নাক, গলা ও শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে। একসময় একে ‘শিশুদের শ্বাসরোধকারী দেবদূত’ বলা হতো, কারণ এটি আক্রান্ত শিশুর গলায় একটি পুরু ধূসর আস্তরণ তৈরি করে। এর ফলে শ্বাস নিতে ও খাবার গিলতে প্রচণ্ড সমস্যা হয় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে হার্ট বা স্নায়ুর ক্ষতি হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। হাঁচি, কাশি বা আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও পরামর্শ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা **ড. মুশতাক হোসেন** বলেন, "হাম-পরবর্তী সময়ে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। এই সুযোগে ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। দ্রুত দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ বুস্টার ডোজ ক্যাম্পেইন চালু করা জরুরি।"

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ওষুধের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ডিপথেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘অ্যান্টিটক্সিন সেরাম’ ও প্রয়োজনীয় কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত নয়। ফলে প্রাদুর্ভাব বাড়লে রোগীদের সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

সরকারি ভাষ্য
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, ডিপথেরিয়ার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় করণীয় নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

প্রতিরোধের উপায়

ডিপথেরিয়া থেকে বাঁচতে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় পেন্টাভ্যালেন্ট ও ডিপিটি টিকা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। এছাড়া জনাকীর্ণ স্থানে মাস্ক ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এই রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow