উড়াল ও পাতালের সমন্বয়ে নির্মিত হচ্ছে মেট্রোরেল ‘লাইন-৫
রাজধানীর যানজট নিরসনে ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে মেট্রোরেল ‘এমআরটি লাইন-৫’ (নর্দান রুট) প্রকল্পের কাজ। হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত এই রেলপথটি হবে উড়াল ও পাতাল পথের এক অনন্য সমন্বয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে মাত্র ৩২ মিনিট।
প্রকল্পের বিস্তারিত:
হেমায়েতপুর থেকে শুরু হয়ে গাবতলী, কচুক্ষেত ও বনানী হয়ে ভাটারা পর্যন্ত যাবে এই লাইনটি। মোট ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মধ্যে ১৩.৫০ কিলোমিটার হবে মাটির নিচে (পাতাল) এবং বাকি ৬.৫০ কিলোমিটার হবে উড়াল পথ। এই রুটে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে, যার মধ্যে ৯টি মাটির নিচে এবং ৫টি হবে উঁচুতে। ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ:
২০১৯ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬১ কোটি টাকা। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল হক বলেন, "মেট্রোরেল মূলত সাধারণ মানুষের জন্য। এর নির্মাণ ব্যয় ও পরিচালনা খরচ যদি লাগামহীনভাবে বেড়ে যায়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভাড়ার ওপর। নির্মাণ ব্যয় সাশ্রয়ী করতে বিশ্বের অনেক দেশই এখন উড়াল পথের (Elevated) দিকে ঝুঁকছে। আমাদেরও খরচের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে।"
আরেক বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান জানান, "ম্যাস ট্রানজিটের মূল উদ্দেশ্যই হলো সাধারণ মানুষকে সুলভে সেবা দেওয়া। পাতাল রেলের খরচ উড়াল পথের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এই উচ্চ ব্যয়ের বোঝা যেন শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপর না চাপে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।"
সরকারের অবস্থান:
নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি ও ভাড়ার প্রভাব নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। এ প্রসঙ্গে সড়ক ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ বলেন, "মাটির নিচে কাজ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। খরচ বাড়লে স্বভাবতই যাত্রীদের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়। আমরা বর্তমানে এই রুটের ওপর বিভিন্ন সমীক্ষা চালাচ্ছি। সুবিধাভোগীরা কতটুকু ব্যয়ভার বহন করতে পারবে, তা যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
বর্তমান অগ্রগতি:
প্রকল্পের কাজ মোট ১০টি প্যাকেজের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। বর্তমানে হেমায়েতপুর ডিপোর ভূমি উন্নয়নের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৭৭.৫৬ শতাংশে। মেট্রোরেল আইন ২০১৫ ও বিধিমালা ২০১৬ অনুযায়ী এই রুটের ভাড়া নির্ধারণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, উত্তরা-মতিঝিল (লাইন-৬) রুটের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্যয় সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব উপায়ে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করা উচিত। দৈনিক ১২ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই মেগা প্রকল্পটি ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ