ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু

জায়শা জাহান মিমি, স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ
Apr 8, 2026 - 22:59
Apr 8, 2026 - 22:59
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর পশ্চিম ইউনিয়নের মৈশাইর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম চেয়ারম্যান বাড়িতে মিরুফা আক্তারের (২৪) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পরিবারের লোকজনের দাবি স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন মিরুফা আক্তার কে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। যৌতুকের দাবিতে ঐ গৃহবধূকে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা করেছে বলে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও ন্যায়বিচারের জোরালো দাবি উঠেছে। 

মিরুফা আক্তার একই গ্রামের সফিউল্লাহর ছেলে আল-আমিনের স্ত্রী ও কালা মিয়ার মেয়ে। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারী একই গ্রামের সফিউল্লাহর ছেলে আল আমিনের সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে ৫ লক্ষ টাকা যৌতুকের দাবিতে মিরুফার উপর স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে আসছে।

বিয়ের সময় ভুক্তভোগীর পরিবার সাধ্যমতো ফার্নিচার, আসবাবপত্র দিলেও বিয়ের পরপরই শুরু হয় নির্যাতনের নতুন অধ্যায়। স্বামী আল-আমিনসহ শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা যৌতুক হিসেবে ৫ লক্ষ টাকা দাবি করে এবং যৌতুকের দাবিতে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকে মিরুফার উপর। এমনকি অনেক সময় তাকে অনাহারে রাখা ও মারধর করার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগে পাওয়া গেছে।

জানা যায়, যৌতুক এর টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মিরুফা আক্তারের উপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে স্বামী আল-আমিনের নির্দেশে অন্য আসামীরা তাকে জাপটে ধরে এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে বলে পরিবারের লোকজনের অভিযোগ। 

এরপর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তারা মরদেহের গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যার নাটক সাজায়। পুরো ঘটনাই রহস্যজনক। মিরুফার শ্বশুরবাড়ির হাজী ফতে আলীর ছেলে হুমায়ুন মিয়া মিরুফার ভাই মামলার বাদী আলমগীর হোসেনকে মুঠোফোনে জানায়, তোমার বোন সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁসি লাগিয়েছে। ঘটনার পর মিরুফার বাড়ির লোকজনকে বিভিন্নভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে একবার বলেছে মিরুফাকে নিয়ে আশুগঞ্জ হাসপাতালে আছি, আবার বলেছে ঘাটিয়ারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছি। মিরুফার ভাই সেখানে গেলে, আবার বলেছে মিরুফাকে নিয়ে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে আছি, অথচ তিনটি হাসপাতালের কোথাও তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে মিরুফার বাড়ির লোকজন পুলিশ নিয়ে গিয়ে দেখে স্বামী আল আমিনের ঘরের মেঝেতে মিরুফার নিথর মৃতদেহ পড়ে আছে। এই অভিনব কৌশলী পথ এবং নাটকীয় তালবাহানায় পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মিরুফার মরদেহ, ফাঁসি দেওয়া অবস্থা থেকে পুলিশ ছাড়া কারো হাত দেয়ার এখতিয়ার নেই। আরো রহস্যজনক বিষয় হলো মিরুফার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থা থেকে কে নামিয়েছে? এই গুঞ্জন এখন ওই এলাকার মানুষের মুখে মুখে। নাম প্রকাশ এলাকাবাসীর বক্তব্যে জানা যায়, এটা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত হত্যা। ঘটনার পর আশুগঞ্জ থানায় মামলা করতে গেলে থানার ওসি একটি দায়সারা ও অপমৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে তাদের আদালতে মামলা করেন বলে থানা থেকে বিদায় করে দেন। এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ (ক)/৩০ ধারায় গত ২ মার্চ একটি মামলা দায়ের করেন। মিরুফা একজন মাদ্রাসার শিক্ষিকা ছিলেন বলে সূত্রে জানা যায়। 

মামলার আসামীরা হলেন, স্বামী আল-আমিন (৩০) কে। অন্যান্য আসামীরা হলেন,শ্বশুর সফিউল্লাহ (৫৩), শাশুড়ি রাশিদা বেগম (৫০), দেবর মুসাব্বির (২২), হাবিবুল্লাহ (৪৮) এবং একই এলাকার প্রভাবশালী ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতাধর হাজি ফতে আলীর ছেলে হুমায়ূন (৪৩)।

মামলার বাদী আলমগীর অভিযোগ করে বলেন- আমার বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদনের সময় আমরা শরীরে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন দেখেছি। আসামীরা প্রভাবশালী হওয়ায় প্রথমে থানায় মামলা নিতে গড়িমসি করেছে পুলিশ। এজন্য আমরা আদালতের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি। আমরা এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

ঘটনার পর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে পাঠায়। বর্তমানে মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এ বিষয়ে আশুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ এ কে এম সফিকুল আলম চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি কল রিসিভ করেননি। 

বাদীপক্ষের অভিযোগ প্রভাবশালীদের চাপের মুখে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে পারে। আসামিরা সেই অপচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। 

যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি এখনো এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্ম দিচ্ছে। যা সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক।

এলাকাবাসী দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামীদের গ্রেফতার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মামলার বাদী মিরুফার পরিবারের লোকজনকে আসামীরা বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow