দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার: ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার দাবি বিশেষজ্ঞদের, সরকারের ভিন্নমত

অনলাইন ডেস্কঃ
May 11, 2026 - 14:37
দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার: ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার দাবি বিশেষজ্ঞদের, সরকারের ভিন্নমত

বাংলাদেশে হামের পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত দুই মাসের কম সময়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। দেশের ৬৪টি জেলাই এখন এই সংক্রমণের কবলে। এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেশে ‘স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ বা মহামারি ঘোষণার তাগিদ দিলেও সরকার বলছে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মৃত্যুর মিছিল ও সংক্রমণের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে নিশ্চিতভাবে ৬৫ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৪৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে। এই সময়ে প্রায় ৪৯ হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে ৩৫ হাজার শিশুকে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১ শিশুর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, এপ্রিলের শেষ নাগাদ দেশের ৬১টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে জনস্বাস্থ্যবিদদের দাবি, বর্তমানে দেশের সবকটি জেলাতেই হামের প্রাদুর্ভাব বিদ্যমান।

বিশেষজ্ঞদের অবস্থান: কেন ‘জরুরি অবস্থা’ প্রয়োজন?
জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ববিদেরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল আঞ্চলিক প্রাদুর্ভাব নয়, বরং এটি একটি জাতীয় মহামারি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, "গত পাঁচ বছরের গড় সংক্রমণের তুলনায় এবারের প্রকোপ অনেক বেশি। এটি স্পষ্টভাবেই মহামারির পর্যায়ে পড়ে।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যায়:
১. দ্রুত ব্যবস্থাপনা: সরকারি সকল সংস্থাকে একযোগে কাজে লাগানো যায়।
২. জরুরি ক্রয়: সাধারণ সময়ে ওষুধ বা টিকা কেনা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হলেও জরুরি অবস্থায় এক সপ্তাহের মধ্যে তা সম্পন্ন করা সম্ভব।
৩. সমন্বিত পদক্ষেপ: আপৎকালীন পরিকল্পনা বা ‘কন্টিনজেন্সি প্ল্যান’ দ্রুত কার্যকর করা যায়।

সরকারের দাবি: ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’
তবে এখনই মহামারি বা জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রয়োজন দেখছেন না স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, দেশের ৯৬ শতাংশ শিশু ইতিমধ্যেই টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এসেছে এবং বাকিদের জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বেশি সংক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসা সেবা জোরদার করা হয়েছে।

প্রশাসনিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা
রোগতত্ত্ববিদ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, বাংলাদেশে সাধারণত ভাবমূর্তি রক্ষার্থে বা জনআতঙ্ক এড়াতে সরকার মহামারি ঘোষণা করতে চায় না। তিনি বলেন, "বাস্তবতা অস্বীকার করলে সংকট আড়াল হয় না। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে শিশুমৃত্যু আরও কমানো সম্ভব হতো।"

অন্যদিকে, ‘সংক্রামক রোগ আইন ২০১৮’ থাকলেও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনিকভাবে সেটি কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান।

উপসংহার
টিকাদান কর্মসূচি চললেও মৃত্যুর হার না কমায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নিয়মিত টিকাদান নয়, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতা। সরকার এবং বিশেষজ্ঞ মহলের এই দ্বিমতের মাঝে সাধারণ শিশুদের জীবন রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow