ফুকুশিমা-চেরনোবিলের শিক্ষা: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘ ৭২ বছরের ইতিহাসে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে মাত্র চারটি। তবে এই সামান্য কয়েকটি ঘটনাই বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক স্তরের আধুনিক ও শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি ১০ লাখ বছরে মাত্র একবার
রুশ কর্তৃপক্ষের করা নিরাপত্তা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রূপপুরের মতো অত্যাধুনিক (তৃতীয় প্রজন্মের) বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা ১০ লাখ বছরে মাত্র একবার। বর্তমান প্রযুক্তিতে কোনো অভ্যন্তরীণ ত্রুটি বা বিচ্যুতি দেখা দিলে কেন্দ্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেকে সিলগালা করে দেয়, যা বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে।
বহুমাত্রিক নিরাপত্তা অবকাঠামো
যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রূপপুর প্রকল্পে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন পদক্ষেপ:
ভূগর্ভস্থ নিরাপত্তা কক্ষ: বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে মাটির গভীরে একটি বিশেষ ইভাকুয়েশন সেন্টার বা নিরাপত্তা কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এখানে প্রকল্পের ২,৫০০ কর্মী অন্তত তিন দিন সম্পূর্ণ নিরাপদে অবস্থান করতে পারবেন।
বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র: মূল কেন্দ্রের বাইরে গ্রিন সিটিতে আরও একটি নিরাপত্তা কক্ষ রয়েছে, যেখান থেকে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ওয়ার্নিং টাওয়ার: যেকোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিতে কেন্দ্রের চারপাশে ৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ৬৪টি সাইরেন বা সতর্ক সংকেত টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে।
মনিটরিং স্টেশন: পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব পড়ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে রাশিয়ার সহায়তায় বসানো হয়েছে ২৪টি পরিবেশ মনিটরিং স্টেশন।
স্থানীয়দের উদ্বেগ ও কর্তৃপক্ষের আশ্বাস
প্রযুক্তির দিক থেকে প্রকল্পটি নিশ্ছিদ্র হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা ভীতি ও শঙ্কা কাজ করছে। নিরাপত্তার বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রচার ও তথ্যকেন্দ্র চালু করে সাধারণ মানুষের এই ভীতি কাটানোর চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন বলেন, "আল্লাহ না করুন, যদি কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে এটি কেবল প্রকল্পের আওতায় থাকবে না; এটি জাতীয় জরুরি অবস্থায় পরিণত হবে এবং সরকার সরাসরি এর দায়িত্ব নেবে।"
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ