যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পরও ইরানি শাসনব্যবস্থা যে কারণে ভেঙে পড়েনি

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
Mar 25, 2026 - 19:10
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পরও ইরানি শাসনব্যবস্থা যে কারণে ভেঙে পড়েনি

যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস হতে চলল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। এরপর একে একে ইরানের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে একের পর এক শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ।

কিন্তু এত কিছুর পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো ভেঙে পড়েনি। এমন চরম সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতেও দেশটির শাসন কাঠামো কীভাবে অটুট রয়েছে, তা অনেককেই অবাক করেছে।

ইরানের ভেতরে অনেকেই আশা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনেই, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর, যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু তা হয়নি; বরং ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো দৃঢ়ভাবে টিকে আছে।

এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশটির জটিল শাসন কাঠামো এবং ‘সমান্তরাল রাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)-এর ওপর নেতৃত্বের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি, ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর আগে দেশটিতে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে তেহরান। ফলে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। যদিও সর্বোচ্চ নেতা এখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, তবে এর পাশাপাশি আইআরজিসি নামের একটি শক্তিশালী সমান্তরাল কাঠামো বিদ্যমান। আইআরজিসির ক্ষমতা কেবল প্রথাগত সামরিক ম্যান্ডেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

চলমান যুদ্ধে এবং গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের সংঘাতের সময় আইআরজিসির বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। কিন্তু আইআরজিসি বারবারই বলে আসছে, তাদের কেউ নিহত হলে সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য অন্য আরেকজন সবসময় প্রস্তুত থাকেন।

এছাড়া আইআরজিসি আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’কে নিয়ন্ত্রণ করে, যা প্রায় ১০ লাখ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনী। ভিন্নমত দমনে এবং রাজপথে শক্তি প্রয়োগের জন্য প্রায়ই এ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা বাসিজের কিছু চেকপোস্টে হামলা চালিয়েছে। তবে তাতে বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ খর্ব হয়নি। চলতি সপ্তাহে তেহরান থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, বাসিজ বাহিনী এখনো বিভিন্ন শহরে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং সড়কে গাড়ি থামিয়ে নিয়মিত তল্লাশি চালাচ্ছে।

বছরের শুরুতে টানা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ইরানের বিভিন্ন শহর। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তা একেবারে স্থিমিত হয়ে পড়েছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলায় জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষও জনগণকে বাইরে বের হতে নিরুৎসাহিত করছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও মোবাইল ফোনে গণ-এসএমএস পাঠিয়ে রাজপথে আন্দোলনে না নামার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি দেশটিতে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দেশটির বহু মানুষ আজ ইন্টারনেটবিহীন ৬০০তম ঘণ্টা পার করছেন। ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ, সরকারি নজরদারি এবং জরিমানার ভীতির কারণে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে আন্দোলন সমন্বয় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে বড় ধরনের কোনো সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ দেখা যায়নি। উল্টো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রতিদিন রাতে বিভিন্ন শহরে সরকার সমর্থকদের সমাবেশ দেখানো হচ্ছে।

মার্চ মাসের শুরুতে উত্তরাধিকারী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত ইরানি সংবাদমাধ্যমে কেবল তার পাঠানো কয়েকটি লিখিত বার্তা প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে ইসরায়েল তাকেও লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে নতুন সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করে আসছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছেন, ধারাবাহিক হামলা ইরানের কমান্ড কাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং তাদের পাল্টা হামলার ক্ষমতাও দুর্বল করেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাত এখন শেষের দিকে এগোনো উচিত।

তবে বাস্তবে উল্টোটাই ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তেজনা কমার বদলে আরও তীব্র হয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ করে বেরিয়ে আসার কোনো স্পষ্ট উপায় দেখা যাচ্ছে না।

এরই মধ্যে শনিবার জানা গেছে, ইরান তাদের ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ঘাঁটির দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যদিও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্বীপে পৌঁছাতে পারেনি, তবে এই ঘটনায় ইরানের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি, আরেক শীর্ষ নেতা আলী লারিজানি, আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডার এবং সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফের মতো শীর্ষ নেতৃত্ব যদি নিহত হয়েই থাকেন, তবে বর্তমানে ইরানের এসব সামরিক অভিযান কার নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে? আর এত প্রচণ্ড চাপের মুখেও ইরান কীভাবে নিজেদের সক্ষমতা বজায় রাখছে?

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow