নওগাঁয় এসি মেকানিক থেকে কোটিপতি: ভুট্টু-বাঁধন নিয়োগ সিন্ডিকেট নিয়ে তোলপাড়
নওগাঁ সদর উপজেলার বক্তারপুর এলাকার বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন ভুট্টু (এসি ভুট্টু) কয়েক বছর আগেও ছিলেন একজন সাধারণ এসি মেকানিক। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে তার কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আদালত কর্মচারী মামুনুর রশিদ বাঁধন-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একসময় সিঙ্গার কোম্পানি-এর এসি মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন ভুট্টু। পাশাপাশি কিস্তিতে বিক্রিত পণ্যের টাকা আদায়ের কাজও করতেন। সে সময় তার আর্থিক অবস্থা ছিল সাধারণ। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে তার আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে ভুট্টু প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমির মালিক এবং কোটি টাকার সম্পদের অধিকারী। তার এই আকস্মিক সম্পদ বৃদ্ধির উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নওগাঁয়ে দায়িত্ব পালনকালে বিচারক শহিদুল ইসলাম-এর সময় আদালতের কর্মচারী মামুনুর রশিদ বাঁধনের সঙ্গে ভুট্টুর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সে সময় বাঁধন বিচারকের বাসার একান্ত সহকারী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে আদালত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন ভুট্টু।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে মনোয়ার হোসেন ভুট্টু ও মামুনুর রশিদ বাঁধন মিলে একটি নিয়োগ বাণিজ্য চক্র গড়ে তোলেন। এই চক্রের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অন্তত ১১ জনকে আদালতের বিভিন্ন পদে চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় ভুট্টুর আপন ভাই ও ভাবিও রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তারা নওগাঁ আদালতের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জুডিশিয়াল সার্ভিসের নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনায় মামুনুর রশিদ বাঁধনের কারাদণ্ডের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ঘটনার সঙ্গে অতীতের নিয়োগ বাণিজ্যের যোগসূত্র থাকতে পারে।
আদালতপাড়ার একাধিক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “ভুট্টু ও বাঁধনের একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। আদালতের বিভিন্ন কাজে তাদের অদৃশ্য প্রভাব দেখা যায়।” তাদের অভিযোগ, নিয়োগ বাণিজ্যের পাশাপাশি টেন্ডার ছাড়াই আদালতের সরকারি আসবাবপত্র অপসারণসহ বিভিন্ন উপায়ে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।
বর্তমানে মনোয়ার হোসেন ভুট্টুর জীবনযাত্রায়ও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে তিনি নিয়মিত বিমান ব্যবহার করেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, যা তার পূর্বের পেশার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
এ বিষয়ে মনোয়ার হোসেন ভুট্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “সাংবাদিক সাহেব, আপনি ভুল জায়গায় ফোন দিয়েছেন। আমি এখন ঢাকায় দুদকের একটি কাজে ব্যস্ত আছি। যেসব অভিযোগ বলা হচ্ছে, সবই মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।”
অন্যদিকে এলাকাবাসী বলছেন, একজন সাধারণ এসি মেকানিক থেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে কোটি টাকার মালিক হওয়া বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সাম্প্রতিক জালিয়াতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি নিয়োগ প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক উৎস খতিয়ে দেখা হয়, তাহলে একটি বৃহৎ চক্রের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
What's Your Reaction?
আব্দুল মজিদ মল্লিক, জেলা প্রতিনিধি, নওগাঁঃ