আলফাডাঙ্গার পানাইলে তরুণ উদ্যোক্তার তাঁতে বুনছে কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনার নতুন গল্প

কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
Mar 16, 2026 - 22:17
আলফাডাঙ্গার পানাইলে তরুণ উদ্যোক্তার তাঁতে বুনছে কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনার নতুন গল্প

ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও নান্দনিকতার প্রতীক জামদানি শাড়ি। যুগ যুগ ধরে বাঙালি নারীর পছন্দের শীর্ষে থাকা এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ি এখন তৈরি হচ্ছে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়। মধুমতী নদীর তীরঘেঁষা উপজেলার পানাইল গ্রামে এক তরুণ উদ্যোক্তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় একটি জামদানি তাঁতপল্লী, যেখানে বোনা হচ্ছে স্বপ্ন, কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনার নতুন গল্প।

ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার কারিগররা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে সূক্ষ্ম নকশায় জামদানি শাড়ি বোনার কাজ। ঈদের চাহিদা মেটাতে অনেক সময় নির্ঘুম রাতও কাটাতে হচ্ছে তাদের।

জানা যায়, উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের পানাইল গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মোস্তফা রহমানের হাত ধরেই এ উদ্যোগের সূচনা। প্রায় ২১ বছর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিভিন্ন তাঁতপল্লীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি নিজ গ্রামেই জামদানি তৈরির উদ্যোগ নেন।

২০২১ সালে করোনাকালে কর্মহীন সময়কে নতুন সম্ভাবনায় রূপ দিতে নিজের বাড়িতে একটি তাঁত বসিয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন জামদানি বোনা। ধীরে ধীরে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বর্তমানে সেখানে ৮টি তাঁতে ১০ থেকে ১২ জন কারিগর কাজ করছেন।

উদ্যোক্তা মোস্তফা রহমান বলেন, দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জের তাঁতপল্লীতে কাজ করেছি। করোনার সময় বাড়িতে এসে ভাবলাম, নিজের গ্রামেই কিছু করা দরকার। তাই একটি তাঁত দিয়ে শুরু করি। এখন ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়ছে।

তিনি জানান, কারখানা গড়ে তুলতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫টি জামদানি শাড়ি তৈরি হয়। নকশা ও কাজের ধরন অনুযায়ী প্রতিটি শাড়ির দাম ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় এক লাখ টাকার মতো আয় হয়।

শাড়ির পাশাপাশি এখানে জামদানি থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির কাপড়ও তৈরি ও বিক্রি করা হয়, যা স্থানীয় ও অনলাইন ক্রেতাদের কাছে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি জামদানি শাড়ি তৈরিতে দুজন কারিগর একসঙ্গে কাজ করেন। সূক্ষ্ম সুতা হাতে ঘুরিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে শাড়ি বোনা হয়। নকশা অনুযায়ী একটি শাড়ি তৈরি করতে তিন থেকে দশ দিন সময় লাগে। আর জটিল নকশার ক্ষেত্রে একটি শাড়ি তৈরি করতে চার মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

কারখানার শ্রমিক কানাইপুরের ইমন বলেন, দুই বছর ধরে এখানে কাজ করছি। সামনে ঈদ, তাই কাজের চাপ বেশি। বেশি শাড়ি বুনতে পারলে আমাদের আয়ও বাড়ে।

স্থানীয়দের মতে, এমন উদ্যোগ আলফাডাঙ্গার জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পানাইল গ্রামটি ভবিষ্যতে বড় জামদানি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা এ কে এম মাসুদুল হাসান বলেন, জামদানি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। পানাইলে এ ধরনের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। উদ্যোক্তার সফলতা কামনা করি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজন হলে তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত নূর মৌসুমী বলেন, আলফাডাঙ্গায় ব্যক্তি উদ্যোগে জামদানি শিল্প গড়ে ওঠা অত্যন্ত ইতিবাচক। এতে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।

উদ্যোক্তা ও কারিগরদের আশা, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে আলফাডাঙ্গাতেই বড় পরিসরে জামদানি শিল্প গড়ে উঠবে। এতে যেমন স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, তেমনি দেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্পও পাবে নতুন দিগন্ত।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow