তদন্ত শেষ, প্রতিবেদন নেই এডিপিওর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ

আলমাস বেপারী, কালকিনি প্রতিনিধি, মাদারীপুরঃ
Feb 4, 2026 - 14:53
Feb 4, 2026 - 14:53
তদন্ত শেষ, প্রতিবেদন নেই এডিপিওর বিরুদ্ধে  গাফিলতির অভিযোগ

মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৩ নম্বর দক্ষিণ রাজদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা ১৪টি গুরুতর অভিযোগের তদন্ত শেষ হলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এডিপিও) মোঃ মজনু রহমানের বিরুদ্ধে।

গত ১৭ ডিসেম্বর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এডিপিও মোঃ মজনু রহমানকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী গত ৫ জানুয়ারি তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলেও এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। এতে অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে পঞ্চম শ্রেণি পাশের প্রত্যয়নপত্র প্রদানে অর্থ আদায়, ২০২১–২২ অর্থবছরে ‘প্লেয়িং এক্সারসাইজ’ খাতে বরাদ্দ পাওয়া ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার কোনো কাজ না করা, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ওয়াশ ব্লকের বাজেট ও ভাউচারে পানির ট্যাংক ক্রয়ের কথা দেখালেও বাস্তবে ট্যাংক ক্রয় না করার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া প্রতি বছর বরাদ্দকৃত স্লিপ, রুটিন মেইনটেন্যান্স ও ক্ষুদ্র মেরামতের টাকা আত্মসাৎ, লোক দেখানো কাজ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পুরাতন বই সংগ্রহ করে বিক্রি, শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে প্রাইভেট পড়ার জন্য চাপ দেওয়া এবং না পড়লে নম্বর কম দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। ২০১৭ সালে দ্বিতীয় সাময়িক ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার মডেল টেস্টে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত নম্বর কম থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত নম্বর প্রদান করা হয় এবং বিষয়টি ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়া হয়।

এছাড়াও বিদ্যালয়ের দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি টিনশেড ঘর বিক্রি করে দেওয়া, পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষায় হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন সরবরাহ, এবং ২০২৪ সালে চতুর্থ শ্রেণির পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থীর খাতায় প্রশ্নের হুবহু উত্তর পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারী দাবি করেন, তদন্ত প্রতিবেদন ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা হচ্ছে। এতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সুবিধা পাচ্ছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক সরোয়ার হোসেন একবার তাকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। পরে ওই টাকা গত ৫ জানুয়ারি সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে ফেরত দিলে, বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের সামনে এডিপিওর কাছ থেকে সেই টাকা আবার ফেরত নেন প্রধান শিক্ষক। বর্তমানে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য আবার ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রধান শিক্ষক বলেন, দক্ষিণ রাজদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ায় তারা সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন।

এ বিষয়ে কালকিনি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ নাজমুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্তের দায়িত্ব সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না।” প্রধান শিক্ষক কর্তৃক ৫ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে জানি না।”

সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ মজনু রহমান বলেন, “শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার কাজে ব্যস্ত থাকায় তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়েছে। তবে খুব শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।” তিনি প্রধান শিক্ষক কর্তৃক ৫ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষ থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে রক্ষা করার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফজলে এলাহী বলেন, “আমি আজও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, দু-এক দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন দেবেন।”

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow