যুক্তরাষ্ট্রের বলয় ভেঙে চীনের পথে কানাডা: মার্ক কার্নির নতুন পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক বাঁক
‘আমরা বিশ্বকে সেভাবেই গ্রহণ করি, যেভাবে বর্তমানে আছে; আমাদের ইচ্ছেমতো বদলে নিয়ে নয়।’—কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির এই একটি বাক্যই এখন দেশটির পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত শুক্রবার বেইজিংয়ের সঙ্গে কানাডা যে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছে, তা কেবল শুল্ক কমানোর কোনো সাধারণ সমঝোতা নয়। বরং বিশ্লেষকরা একে উত্তর আমেরিকার দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক মেরুকরণে একটি বড় ফাটল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রথাগত প্রভাব বলয় থেকে কানাডার বেরিয়ে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
এই চুক্তির মাধ্যমে গত এক বছরের তিক্ত সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে এবং উভয় দেশই অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) ক্ষেত্রে কানাডা বড় ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কানাডা চীনা ইভির ওপর যে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, তা একলাফে কমিয়ে মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে কার্নি সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রথম ৪৯ হাজার যানবাহন এই সুবিধায় কানাডায় প্রবেশ করবে এবং আগামী পাঁচ বছরে এই কোটা ৭০ হাজার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর বিনিময়ে বেইজিংও কানাডার কৃষি ও মৎস্য খাতের জন্য দুয়ার খুলে দিয়েছে। কানাডীয় ক্যানোলা বীজের ওপর চীন তাদের প্রতিশোধমূলক শুল্ক ৮৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি লবস্টার (সামুদ্রিক চিংড়ি), কাঁকড়া, মটরশুঁটি এবং ক্যানোলা মিলের ওপর থেকে শুল্ক সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া কানাডীয় পর্যটকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া শিথিল করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বেইজিং।
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার এই ‘রিক্যালিব্রেশন’ বা নীতি পরিবর্তনের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের অস্থির বাণিজ্য নীতি। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা ইউএসএমসিএ-কে ট্রাম্প ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে হুমকি দেওয়ায় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের চেয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এখন কানাডার কাছে অনেক বেশি ‘অনুমানযোগ্য’। মূলত ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো কার্যকর বাণিজ্যিক সমঝোতা না থাকার আশঙ্কাই কানাডাকে চীনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চুক্তিটি প্রকাশের পরপরই কানাডার অভ্যন্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কৃষিপ্রধান প্রদেশ সাসকাচোয়ানের মুখ্যমন্ত্রী স্কট মো একে ‘খুব ভালো খবর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। চীনের শুল্ক হ্রাসের ফলে কানাডীয় কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে ওন্টারিও প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ড এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সস্তা চীনা ইভির অবাধ প্রবেশ কানাডার দেশীয় গাড়ি শিল্প ও কর্মসংস্থানকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে। ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বিবেক আস্তভাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এর ফলে কানাডার ইভি বাজারের ১০ শতাংশ দ্রুতই চীনাদের দখলে চলে যেতে পারে, যা টেসলার মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়াতেও দেখা গেছে নাটকীয়তা। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এই চুক্তিকে ‘সমস্যাজনক’ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, এর জন্য কানাডাকে ভবিষ্যতে অনুশোচনা করতে হতে পারে। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। আগামী এপ্রিলে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নেওয়া ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, চীনের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা সম্ভব হলে সেটা করা উচিত।
ম্যাকগিল এবং ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তির ফলে কানাডীয় ভোক্তারা হয়তো সস্তায় উচ্চমানের বৈদ্যুতিক গাড়ি পাওয়ার সুযোগ পাবেন, কিন্তু কার্নি সরকারকে এখন দেশীয় শিল্প রক্ষায় নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে ভাবতে হবে। চীনের ৭০ শতাংশ বৈশ্বিক ইভি উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে কানাডা কীভাবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
What's Your Reaction?
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ