রুমায় রেঞ্জ কর্মকর্তার যোগসাজশে অবাধে চলছে কাঠ পাচার: জনবহুল এলাকায় অবৈধ ডিপো

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
Feb 3, 2026 - 19:51
Feb 3, 2026 - 19:51
রুমায় রেঞ্জ কর্মকর্তার যোগসাজশে অবাধে চলছে কাঠ পাচার: জনবহুল এলাকায় অবৈধ ডিপো

বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে গড়ে উঠেছে অবৈধ কাঠের রমরমা ব্যবসা। রুমা উপজেলা সদরের ব্যস্ততম বাস স্টেশনের লাগোয়া জনবহুল স্থানে অনুমোদনহীন কাঠের ডিপো স্থাপন করায় সাধারণ যাত্রী ও স্থানীয়দের চলাচল চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। রুমা সদর, পলি, পাইন্দু ও প্রানসা রেঞ্জের বিভিন্ন মৌজার ভুয়া জোত পারমিট ব্যবহার করে ৩৫৬ নং পলি মৌজা থেকে প্রতিনিয়ত পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান কাঠ।

স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, এই অবৈধ কর্মযজ্ঞের মূল নেপথ্যে রয়েছেন বান্দরবান পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার ও পলি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ফারুক আহমেদ বাবুল।

গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি ২০২৬) সরেজমিনে দেখা যায়, রুমা-বান্দরবান প্রধান সড়কের পাশে বাস স্টেশনের গা ঘেঁষেই গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল কাঠের স্তূপ। পুরোনো জরাজীর্ণ ত্রিপল ও চটের বস্তা দিয়ে ঘিরে রাখা স্থানটি বন বিভাগের অনুমোদিত কোনো ডিপো নয়। অথচ কোনো বন কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়াই এখান থেকে দিন-রাত ট্রাকে কাঠ লোড-আনলোড করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, ব্যস্ততম এই সড়কে গাছের বোঝা নিয়ে ট্রাক চলাচলের কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। মো. কায়ুম (৪৩) নামের এক যাত্রী বলেন, "বন দস্যুরা এলাকার সব গাছ কেটে উজাড় করে ফেলছে, আর রাস্তার ওপর এই ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।"

অভিযোগ রয়েছে, রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ফারুক আহমেদ বাবুল সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কর্মস্থলে না থেকে বান্দরবান জেলা সদরে অবস্থান করেন। স্থানীয়দের মতে, তিনি অফিসে না বসলেও বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আঁতাত করে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ আদায় করেন। জোত পারমিটের সঙ্গে বাস্তব বাগানের গাছের মিল না থাকলেও অর্থের বিনিময়ে তিনি পাচারের সুযোগ করে দেন।

৩৫৬ নং পলি মৌজার হেডম্যান চিংসাঅং মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "মিনজিরি পাড়ার কিছু লোক ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে আমার এলাকা থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে গাছ কাটছে। তদন্ত ছাড়াই পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে আমার এলাকা থেকে আনুমানিক ৫০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের কাঠ পাচার হয়ে গেছে।"

অবৈধ ডিপোর চৌকিদার দুদু জানান, মো. জাহাঙ্গীর, সালাউদ্দীন, মহিউদ্দীন ও নাসিরসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এই কাঠ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা বান্দরবান সদরে অবস্থান করলেও তাদের প্রতিনিধিরা এখান থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পলি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ফারুক আহমেদ বাবুল অনিয়মের বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, "সব জায়গায় সঠিক কাজ করা যায় না, একটু গড়মিল তো থাকেই। রুমা বাস স্টেশনের পাশের জায়গাটি বন বিভাগের নয় এবং সেখানে কোনো অনুমোদিত ডিপোও নেই।" উল্টো তিনি সংবাদকর্মীদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করে বলেন, "সবাই সুবিধা পাচ্ছে, আপনারাও পাবেন। লেখালেখি করার দরকার নেই।"

এ বিষয়ে রুমা কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মাসুদ রানা মাসুম দাপটের সঙ্গে বলেন, "হ্যাঁ, আমরাই ফিল্ডটি চালাচ্ছি। কোনো সমস্যা হলে আমরা দেখব।"

এ প্রসঙ্গে বান্দরবান পাল্পউড বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আবু ইউসুফ বলেন, "আপনাদের তথ্য সঠিক। রুমায় বর্তমানে কোনো অনুমোদিত কাঠের ডিপো নেই। জনবহুল এলাকায় এভাবে কাঠ মজুত করা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অবৈধ ডিপোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মে জড়িত বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow